ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার মৃৎশিল্পীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন। মাটির হাঁড়ি-পাতিল, কলস, ব্যাংক, প্রদীপ, খেলনা ও বিভিন্ন শৌখিন পণ্য তৈরিতে দিনরাত পরিশ্রম করছেন তারা।
প্রতিবছর এই দুই উৎসবের আগে মৃৎশিল্পীদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। বিশেষ করে, বৈশাখের জন্য বাহারি ধরনের হাঁড়ি, পুতুল, হাড়িপান, কুলা ও ব্যাংকের চাহিদা থাকে বেশি। অন্যদিকে, ঈদের বাজারে শিশুদের জন্য মাটির খেলনা ও পিগি ব্যাংকের চাহিদা থাকে তুঙ্গে।
কোটালীপাড়া উপজেলার হিরণ, আলিঠাপাড়া, কলাবাড়ি, দেবগ্রামসহ কয়েকটি এলাকায় বেশ কিছু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের আধিপত্যের কারণে এই শিল্প কিছুটা হুমকির মুখে থাকলেও, উৎসবকে কেন্দ্র করে এখনও ভালো বিক্রি হয়।
বুধবার (১৯ মার্চ) সকালে সরেজমিনে হিরণ গ্রামের কুমার পাড়ায় গিয়ে শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সকল বয়সের নারী পুরুষকে মাটির বিভিন্ন খেলনা তৈরীর কাজে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। কেউ কাঁদামাটি ছেনে তৈরী করছে পুতুল, কেউ ব্যস্ত খেলনা তৈরীতে। অনেককে দেখা যায় এসব রোদে শুকাতে। কেউবা রং তুলির আঁচড়ে এসব সামগ্রীকে রাঙিয়ে তুলছেন। বাড়ির উঠোন থেকে শুরু করে ঘরের মেঝে, টিনের চাল কোথাও এক ইঞ্চি পরিমান জায়গা ফাঁকা নেই। সর্বত্র থরে থরে সাজিয়ে রাখো হয়েছে মাটির তৈরী এসব সামগ্রী। এখানে ৪৫ টি পাল পরিবার এখনও টিকে রয়েছেন মৃৎ শিল্পের সাথে।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী বিশ্বজিত পাল বলেন, ঈদ ও বৈশাখী মেলা উপলক্ষে বর্তমানে আমাদের কাজের খুব চাপ। যে কারনে লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে আমিও কাজে হাত লাগাই বাবা-মায়ের সাথে।
সমাপ্তি পাল বলেন, আমি হিরণ পঞ্চপল্লী উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণিতে পড়ি। রমজান মাস উপলক্ষে বিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে অন্যদিকে বাড়িতে মাটির জিনিসপত্র তৈরীর কাজের চাপও বেশি তাই আমি মাটির সামগ্রীগুলো রংয়ের কাজ করছি।
মৃৎশিল্পী বলাই পাল বলেন, “বৈশাখ এলে আমাদের ব্যবসা একটু চাঙা হয়। এবারও প্রচুর অর্ডার পাচ্ছি, বিশেষ করে ব্যাংক ও খেলনার। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিমাণ কমে গেছে।”
আরেকজন মৃৎশিল্পী সুখদেব পাল জানান, “আমরা পরিবার নিয়ে দিনরাত পরিশ্রম করছি। এবার ঈদ আর বৈশাখ কাছাকাছি হওয়ায় কাজের চাপ দ্বিগুণ হয়েছে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা বেশি, তাই লাভের বিষয়টা নির্ভর করছে পাইকারি বিক্রির ওপর।”
তিনি আরো বলেন, স্থানীয় বাজার ছাড়াও এসব মাটির জিনিসপত্র ঢাকা, খুলনা, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। পাইকাররা এসে এগুলো কিনে নিয়ে যান। তাছাড়া বিভিন্ন মেলা বা উৎসব স্থলে নিজেরাও বিক্রি করি। তবে মৃৎশিল্পীরা জানান, মাটির দাম, কাঠ ও জ্বালানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় তাদের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
সত্তোরর্ধ দেবী রাণী পাল বলেণ, এখন সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। আগের মত মাটির তৈরী জিনিসের চাহিদাও নেই। তাই সরকারিভাবে আমাদের কে যদি একটু সহযোগিতা করা হতো বা স্বল্প সুদে ঋণ এবং আধুনিক চুল্লি স্থাপনের সুযোগ পেলে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও রমরমা হয়ে উঠবে। তাহলে আমরা পুরাতন এই শিল্পটাকে ধরে রাখতে পারতাম।
কোটালীপাড়া উপজেলা সমাজসেবা অফিসার রাকিবুল ইসলাম শুভ বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠির জীবন মান উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প ছিল। এই প্রকল্পের মাধ্যমে মৃৎ শিল্পীদের সহযোগিতা করার সুযোগ ছিল। বর্তমানে এই প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। পরবর্তীতে প্রকল্পটি চালু হলে তাদেরকে সহযোগিতা করা হবে।
ঈদুল ফিতর ও পহেলা বৈশাখ কোটালীপাড়ার মৃৎশিল্পীদের জন্য নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে দেয়। তারা এখন উৎসবের জন্য তৈরি করতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন। অন্যথায়, এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
মনিরুজ্জামান শেখ জুয়েল, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: 


















