ঢাকা ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনিয়ম করলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্য প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ সনাতন আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক তরুন, সদস্য সচিব সফল দাশ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি জনগণের অধিকার সুরক্ষাও জরুরি : তথ্য প্রতিমন্ত্রী ৭৭ বছরের ভারতীয়ের চ্যাটজিপিটিকে ‘স্যার’ ডেকে ভাইরাল হওয়ার কাহিনি টঙ্গীতে ১৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারী মাদক কারবারি আটক টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বেঁচে আছেন ক্রিস্টা পাইক নেত্রকোনায় ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগ হইচইয়ের নতুন সিরিজ ‘শলাকা রহস্য’ প্রকাশ্যে, তৃণা সাহার পোস্টার উন্মোচন জামালপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন মতলবে ট্রাক্টরের ধাক্কায় তরুণের মৃত্যু

কুকুরের প্রতি রনির অনন্য ভালোবাসা

পথের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো যেন খুঁজে পেয়েছে আপন ঠিকানা। মানুষের মতো ৩ বেলা মিলছে খাবার। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে জড়ো হয় ২৫ থেকে ৩০ টি কুকুর। আর এই কুকুরগুলোকে খাবারের ব্যবস্থা করছেন গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার ঘাঘর বাজারের মোবাইল মেকানিক জি এম রনি। কুকুরের জন্য এই খাবারের তালিকায় রয়েছে দুধ মাখানো ভাত, পাউরুটি ও বিস্কুট। তবে বাড়িতে যেদিন মাংস রান্না হয় সেদিন কুকুরের জন্য রান্না করা মাংস আনতে ভুলেন না জি এম রনি।

স্বামী বিবেকানন্দের একটি অমর বাণী ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। এই বাণীটি যেন সত্যি হয়ে উঠেছে কুকুরের প্রতি রনির ভালোবাসা দেখে। প্রায় ৫ বছর ধরে এভাবে কুকুরকে প্রতিদিন ৩ বেলা খাবার দিয়ে ভালোবাসার এক অন্যরকম নজির স্থাপন করে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। যা স্থানীয়দের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

রনি উপজেলার দক্ষিণ কয়খা গ্রামের আবুল হোসেন গাজীর ছেলে। তিনি স্থানীয় ঘাঘর বাজারে প্রায় ৭ বছর ধরে মোবাইল মেকানিকের কাজ করে আসছেন। ছোট বেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি রনির ছিল অন্যরকম ভালবাসা। সেই ভালবাসা থেকেই তার চলার পথে সামনে কখনো কুকুর-বিড়াল পড়লে তাদেরকে খাবার কিনে খাওয়াতেন।

করোনাকালীন সময়ে লকডাউনে ঘাঘর বাজারের দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্যের অভাবে বিপাকে পড়ে যায় বাজারে থাকা কুকুরগুলো। এসময় ভালোবাসার টানে কুকুরগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন রনি। এই লকডাউনে যখন প্রশাসনের চাপ ও মৃত্যুভয়ে মানুষ ঘরবন্দি তখন নিজ বাড়ি থেকে রান্না করে ঘাঘর বাজারে থাকা কুকুরগুলোর জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে আসেন রনি। প্রথমে ৫ থেকে ৭ টি কুকুর থাকলেও ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ কুকুরকে ৩ বেলা খাবারের ব্যবস্থা করছেন তিনি।

শুধু যে কুকুরগুলোকে ৩ বেলা খাবার দেন তাহাই নয়। কোন একটি কুকুর অসুস্থ হলে বা কেউ আঘাত করলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন রনি। নিজ হাতে ওষুধও খাইয়ে দেন অসুস্থ কুকুরগুলোকে। কোন কুকুরের গায়ে ক্ষত বা ঘাঁ হলে নিজ হাতে তা পরিস্কার করে মলম লাগিয়ে দেন।

প্রথম দিক দিয়ে জি এম রনির আশপাশের ব্যবসায়ীরা ও পরিবারের লোকজন তাঁর এই কাজে বিরাগভাজন হলেও এখন সবাই প্রংশসা করছেন। এই কুকুরগুলোর জন্য নিয়মিত ৩ বেলা ভাত রান্না করে দিয়ে রনিকে রনিকে সহযোগিতা করছেন তার স্ত্রী। শুধু স্ত্রীই নয়, মা-বাবা ও তার বন্ধুরাও নিয়মিত সহযোগিতা করছেন বলে জানিয়েছেন এই প্রাণীপ্রেমী জি এম রনি।

তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই পোষা প্রাণীদের খুব ভালবাসী। সেই ভালবাসা থেকেই করোনাকালীন সময়ে ঘাঘর বাজারে খাদ্যসংকটে থাকা কুকুরগুলোকে ৩ বেলা খাবার খাওয়ানো শুরু করি। যা আজও চলমান রেখেছি। এখন এসব কুকুরের প্রতি অন্য রকম ভালবাসা তৈরি হয়েছে। আমি এই কুকুরগুলোর প্রতি আমার ভালবাসা এ পর্যায়ে গিয়ে পৌছেছে যে, আমি এখন কোথাও বেড়াতে যেতে পারি না। বেড়াতে গেলে ওদেরকে কে খাওয়াবে? সবসময় এই ভাবনায় থাকি। কুকুরের প্রতি আমার এই ভালবাসা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। তবে কুকুরের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে এভাবে খাওয়ানোর যে কার‌্যক্রম চলছে তা অর্থনৈতিক সংকটের কারনে কতদিন ধরে রাখতে পারবো সেটি এখন চিন্তার বিষয়।

ব্যবসায়ী উজ্জ্বল সাহা বলেন, রনি আমার দোকানে ৬/৭ বছর ধরে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করে। সে করোনার সময় থেকে ঘাঘর বাজারে থাকা কুকুরগুলোকে খাবার দিয়ে আসছে। প্রথম দিকে তার এই কাজ নিয়ে উপহাস করলেও পরে বুঝতে পারি সে যা করছে তা অত্যন্ত মানবিক। এখন আমরা তাকে এই কাজে উৎসাহ দিচ্ছি।

চায়ের দোকানদার আক্কেল আলী বলেন, রনি ভাই প্রতিদিন বাড়ি থেকে ভাত এনে আমার দোকান থেকে দুধ কিনে সেই ভাত দুধ দিয়ে মেখে কুকুরকে খাওয়ায়। কোনদিন ব্যস্ততার ভাত না আনতে পারলে আমার দোকান থেকে রুটি ও বিস্কুট কিনে কুকুরকে খেতে দেয়।

ইলেকট্রোনিক্স ব্যবসায়ী সংকর সাহা বলেন, রনির এমন মানবিক উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মানুষ শুধু মানুষের জন্য নয়, মানুষ সব জীবের জন্য। রনির মত আরও অনেকে এগিয়ে এল পথপ্রাণীরাও সুন্দর জীবন পেতে পারে।

লেখক ও কবি মিন্টু রায় বলেন, রনি যে কাজটি করছে তাহা অত্যন্ত প্রশংসার দাবী রাখে। রনির মতো আমরা যদি সকলে এভাবে প্রাণীকে ভালবাসতাম তাহলে পৃথিবীটি খুব সুন্দর হতো। আমাদের উচিত রনির মতো যারা প্রাণীদের ভালোবাসে তাদের পাশে দাড়ানো।

 

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনিয়ম করলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

কুকুরের প্রতি রনির অনন্য ভালোবাসা

আপডেট সময় : ০২:৫৬:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ মে ২০২৫

পথের বেওয়ারিশ কুকুরগুলো যেন খুঁজে পেয়েছে আপন ঠিকানা। মানুষের মতো ৩ বেলা মিলছে খাবার। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে একসাথে জড়ো হয় ২৫ থেকে ৩০ টি কুকুর। আর এই কুকুরগুলোকে খাবারের ব্যবস্থা করছেন গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার ঘাঘর বাজারের মোবাইল মেকানিক জি এম রনি। কুকুরের জন্য এই খাবারের তালিকায় রয়েছে দুধ মাখানো ভাত, পাউরুটি ও বিস্কুট। তবে বাড়িতে যেদিন মাংস রান্না হয় সেদিন কুকুরের জন্য রান্না করা মাংস আনতে ভুলেন না জি এম রনি।

স্বামী বিবেকানন্দের একটি অমর বাণী ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’। এই বাণীটি যেন সত্যি হয়ে উঠেছে কুকুরের প্রতি রনির ভালোবাসা দেখে। প্রায় ৫ বছর ধরে এভাবে কুকুরকে প্রতিদিন ৩ বেলা খাবার দিয়ে ভালোবাসার এক অন্যরকম নজির স্থাপন করে মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন। যা স্থানীয়দের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।

রনি উপজেলার দক্ষিণ কয়খা গ্রামের আবুল হোসেন গাজীর ছেলে। তিনি স্থানীয় ঘাঘর বাজারে প্রায় ৭ বছর ধরে মোবাইল মেকানিকের কাজ করে আসছেন। ছোট বেলা থেকেই পশুপাখির প্রতি রনির ছিল অন্যরকম ভালবাসা। সেই ভালবাসা থেকেই তার চলার পথে সামনে কখনো কুকুর-বিড়াল পড়লে তাদেরকে খাবার কিনে খাওয়াতেন।

করোনাকালীন সময়ে লকডাউনে ঘাঘর বাজারের দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হয়ে গেলে খাদ্যের অভাবে বিপাকে পড়ে যায় বাজারে থাকা কুকুরগুলো। এসময় ভালোবাসার টানে কুকুরগুলোর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেন রনি। এই লকডাউনে যখন প্রশাসনের চাপ ও মৃত্যুভয়ে মানুষ ঘরবন্দি তখন নিজ বাড়ি থেকে রান্না করে ঘাঘর বাজারে থাকা কুকুরগুলোর জন্য খাবার রান্না করে নিয়ে আসেন রনি। প্রথমে ৫ থেকে ৭ টি কুকুর থাকলেও ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে ২৫ থেকে ৩০ কুকুরকে ৩ বেলা খাবারের ব্যবস্থা করছেন তিনি।

শুধু যে কুকুরগুলোকে ৩ বেলা খাবার দেন তাহাই নয়। কোন একটি কুকুর অসুস্থ হলে বা কেউ আঘাত করলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন রনি। নিজ হাতে ওষুধও খাইয়ে দেন অসুস্থ কুকুরগুলোকে। কোন কুকুরের গায়ে ক্ষত বা ঘাঁ হলে নিজ হাতে তা পরিস্কার করে মলম লাগিয়ে দেন।

প্রথম দিক দিয়ে জি এম রনির আশপাশের ব্যবসায়ীরা ও পরিবারের লোকজন তাঁর এই কাজে বিরাগভাজন হলেও এখন সবাই প্রংশসা করছেন। এই কুকুরগুলোর জন্য নিয়মিত ৩ বেলা ভাত রান্না করে দিয়ে রনিকে রনিকে সহযোগিতা করছেন তার স্ত্রী। শুধু স্ত্রীই নয়, মা-বাবা ও তার বন্ধুরাও নিয়মিত সহযোগিতা করছেন বলে জানিয়েছেন এই প্রাণীপ্রেমী জি এম রনি।

তিনি বলেন, আমি ছোটবেলা থেকেই পোষা প্রাণীদের খুব ভালবাসী। সেই ভালবাসা থেকেই করোনাকালীন সময়ে ঘাঘর বাজারে খাদ্যসংকটে থাকা কুকুরগুলোকে ৩ বেলা খাবার খাওয়ানো শুরু করি। যা আজও চলমান রেখেছি। এখন এসব কুকুরের প্রতি অন্য রকম ভালবাসা তৈরি হয়েছে। আমি এই কুকুরগুলোর প্রতি আমার ভালবাসা এ পর্যায়ে গিয়ে পৌছেছে যে, আমি এখন কোথাও বেড়াতে যেতে পারি না। বেড়াতে গেলে ওদেরকে কে খাওয়াবে? সবসময় এই ভাবনায় থাকি। কুকুরের প্রতি আমার এই ভালবাসা আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। তবে কুকুরের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে এভাবে খাওয়ানোর যে কার‌্যক্রম চলছে তা অর্থনৈতিক সংকটের কারনে কতদিন ধরে রাখতে পারবো সেটি এখন চিন্তার বিষয়।

ব্যবসায়ী উজ্জ্বল সাহা বলেন, রনি আমার দোকানে ৬/৭ বছর ধরে মোবাইল সার্ভিসিংয়ের কাজ করে। সে করোনার সময় থেকে ঘাঘর বাজারে থাকা কুকুরগুলোকে খাবার দিয়ে আসছে। প্রথম দিকে তার এই কাজ নিয়ে উপহাস করলেও পরে বুঝতে পারি সে যা করছে তা অত্যন্ত মানবিক। এখন আমরা তাকে এই কাজে উৎসাহ দিচ্ছি।

চায়ের দোকানদার আক্কেল আলী বলেন, রনি ভাই প্রতিদিন বাড়ি থেকে ভাত এনে আমার দোকান থেকে দুধ কিনে সেই ভাত দুধ দিয়ে মেখে কুকুরকে খাওয়ায়। কোনদিন ব্যস্ততার ভাত না আনতে পারলে আমার দোকান থেকে রুটি ও বিস্কুট কিনে কুকুরকে খেতে দেয়।

ইলেকট্রোনিক্স ব্যবসায়ী সংকর সাহা বলেন, রনির এমন মানবিক উদ্যোগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মানুষ শুধু মানুষের জন্য নয়, মানুষ সব জীবের জন্য। রনির মত আরও অনেকে এগিয়ে এল পথপ্রাণীরাও সুন্দর জীবন পেতে পারে।

লেখক ও কবি মিন্টু রায় বলেন, রনি যে কাজটি করছে তাহা অত্যন্ত প্রশংসার দাবী রাখে। রনির মতো আমরা যদি সকলে এভাবে প্রাণীকে ভালবাসতাম তাহলে পৃথিবীটি খুব সুন্দর হতো। আমাদের উচিত রনির মতো যারা প্রাণীদের ভালোবাসে তাদের পাশে দাড়ানো।