ঢাকা ০৪:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনিয়ম করলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্য প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ সনাতন আইনজীবী পরিষদের আহ্বায়ক তরুন, সদস্য সচিব সফল দাশ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি জনগণের অধিকার সুরক্ষাও জরুরি : তথ্য প্রতিমন্ত্রী ৭৭ বছরের ভারতীয়ের চ্যাটজিপিটিকে ‘স্যার’ ডেকে ভাইরাল হওয়ার কাহিনি টঙ্গীতে ১৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ নারী মাদক কারবারি আটক টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বেঁচে আছেন ক্রিস্টা পাইক নেত্রকোনায় ব্যবসায়ীর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেওয়ার অভিযোগ হইচইয়ের নতুন সিরিজ ‘শলাকা রহস্য’ প্রকাশ্যে, তৃণা সাহার পোস্টার উন্মোচন জামালপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফন সম্পন্ন মতলবে ট্রাক্টরের ধাক্কায় তরুণের মৃত্যু

বিচ্ছিন্ন পদ্মার চরে শিক্ষার নতুন দিগন্ত: মাধ্যমিক থেকে বঞ্চিতদের জন্য প্রথম বিদ্যালয় নির্মাণ

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফরিদপুরের দুর্গম চর নারিকেল বাড়িয়ায় স্থাপিত হলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পিছিয়ে পড়া এই জনপদের শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া ইউনিয়ন, যা নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মতো। চারদিকে প্রমত্তা পদ্মা নদীবেষ্টিত এই চরের প্রায় ২০ হাজার মানুষ এতদিন মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। যেখানে ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার শিশুরা পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত না। তাদের হাতে বই-খাতা-কলমের পরিবর্তে দেখা যেত মাছ ধরার সরঞ্জাম কিংবা গরু-ছাগলের রশি।

তবে এবার সেই চিত্র বদলাতে চলেছে। এ ইউনিয়নের হাওলাদারকান্দি গ্রামে সদরপুর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবং একটি নতুন আশার আলো।

২০২৩ সালে সদরপুরের তৎকালীন ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল এই অঞ্চলে পরিদর্শনে এসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ চিত্র দেখে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আবুল হাওলাদার বিদ্যালয়ের জন্য এক একর জমি দান করেন। এরপর উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুর্গমতা এখানকার মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চরে যেতে হয় ট্রলারে করে, যা সদরপুরের ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী নৌঘাট থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। এমন প্রতিকূলতার মাঝে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন সত্যিই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

স্থানীয় বাসিন্দা রাজামল্লিক জানান, আগে ইচ্ছা থাকলেও পঞ্চম শ্রেণির পর আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হতো না। এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হওয়ায় তাদের সন্তানরা এখন আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সরদার এই উদ্যোগকে চরবাসীর জন্য উপজেলা প্রশাসনের একটি উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর ফলে চরের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটবে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং বেঞ্চসহ শিক্ষা উপকরণও পৌঁছে গেছে। শীঘ্রই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এই চরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। প্রশাসন ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ এই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল হাওলাদার মনে করেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার শিশুরা দূরবর্তী এলাকায় যেতে চাইত না, ফলে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। নতুন বিদ্যালয়টি তাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানা জানান, পূর্বের ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এবং তিনিও এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। চরবাসী তাদের স্বপ্নের বিদ্যানিকেতন পেয়েছে। সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনা হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষা। এই বিদ্যালয়টি সত্যিই এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বাতিঘর হয়ে উঠবে, এমনটাই আশা স্থানীয়দের।

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনিয়ম করলে কঠোর ব্যবস্থা: তথ্য প্রতিমন্ত্রী

বিচ্ছিন্ন পদ্মার চরে শিক্ষার নতুন দিগন্ত: মাধ্যমিক থেকে বঞ্চিতদের জন্য প্রথম বিদ্যালয় নির্মাণ

আপডেট সময় : ০৯:০১:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৫

দীর্ঘ অপেক্ষার পর ফরিদপুরের দুর্গম চর নারিকেল বাড়িয়ায় স্থাপিত হলো মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পিছিয়ে পড়া এই জনপদের শিক্ষার্থীদের জীবনে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো।

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া ইউনিয়ন, যা নয়টি ইউনিয়নের মধ্যে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মতো। চারদিকে প্রমত্তা পদ্মা নদীবেষ্টিত এই চরের প্রায় ২০ হাজার মানুষ এতদিন মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত ছিল। যেখানে ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার শিশুরা পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত না। তাদের হাতে বই-খাতা-কলমের পরিবর্তে দেখা যেত মাছ ধরার সরঞ্জাম কিংবা গরু-ছাগলের রশি।

তবে এবার সেই চিত্র বদলাতে চলেছে। এ ইউনিয়নের হাওলাদারকান্দি গ্রামে সদরপুর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়টি শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবং একটি নতুন আশার আলো।

২০২৩ সালে সদরপুরের তৎকালীন ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল এই অঞ্চলে পরিদর্শনে এসে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের করুণ চিত্র দেখে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয় শিক্ষানুরাগী আবুল হাওলাদার বিদ্যালয়ের জন্য এক একর জমি দান করেন। এরপর উপজেলা প্রশাসনের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে বিদ্যালয়ের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক কামরুল আহসান তালুকদার।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে দুর্গমতা এখানকার মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। উপজেলা সদর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই চরে যেতে হয় ট্রলারে করে, যা সদরপুরের ঢেউখালী ইউনিয়নের শয়তানখালী নৌঘাট থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার পথ। এমন প্রতিকূলতার মাঝে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় স্থাপন সত্যিই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

স্থানীয় বাসিন্দা রাজামল্লিক জানান, আগে ইচ্ছা থাকলেও পঞ্চম শ্রেণির পর আর স্কুলে যাওয়া সম্ভব হতো না। এই মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হওয়ায় তাদের সন্তানরা এখন আরও উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পাবে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন সরদার এই উদ্যোগকে চরবাসীর জন্য উপজেলা প্রশাসনের একটি উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর ফলে চরের শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে এবং অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন ঘটবে। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ের জন্য টিনের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে এবং বেঞ্চসহ শিক্ষা উপকরণও পৌঁছে গেছে। শীঘ্রই শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, এই চরে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। প্রশাসন ও স্থানীয়দের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ এই স্বপ্ন সত্যি হয়েছে।

বিদ্যালয়ের জমিদাতা আবুল হাওলাদার মনে করেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় এখানকার শিশুরা দূরবর্তী এলাকায় যেতে চাইত না, ফলে শিক্ষার হার ছিল খুবই কম। নতুন বিদ্যালয়টি তাদের শিক্ষার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বর্তমান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানা জানান, পূর্বের ইউএনও আহসান মাহমুদ রাসেল এই বিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করেছিলেন এবং তিনিও এই ধারা অব্যাহত রেখেছেন। চরবাসী তাদের স্বপ্নের বিদ্যানিকেতন পেয়েছে। সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ কেনা হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ও পাঠদানের অনুমতির অপেক্ষা। এই বিদ্যালয়টি সত্যিই এই অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থার বাতিঘর হয়ে উঠবে, এমনটাই আশা স্থানীয়দের।