ঢাকা ০৮:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সেগুনবাগিচায় শিশুদের বৈশাখী উৎসব; কৃতি শিক্ষার্থী ও সফল মায়েদের হাতে উঠল পুরস্কার! সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন মটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক জাকির হোসেন বাদশা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণে বিএনপির টানা ৮ দিনের কর্মসূচি ৭ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা জারি এল ক্ল্যাসিকোতে উৎসবের মেজাজে বার্সা নিয়ামতপুরে উন্নয়ন কার্যক্রম ও মানবিক সহায়তায় ব্যস্ত দিন বন্য হাতির তাণ্ডবে রামুতে নিহত মা-মেয়ে পর্নোগ্রাফি মামলায় রাজ-এর আহ্বান, দোষী হলে শাস্তি, নইলে মুক্তি চান চীনের বড় সাফল্য, মিলেছে ২০০টির বেশি নতুন তেল-গ্যাস ক্ষেত্র হাওরে ভয়াবহ ক্ষতি, পানির নিচে ২০০ কোটি টাকার ধান

উত্তেজনা ও মারামারিই যেন আমাদের নিয়তি

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:৫০:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫
  • ১১৬ বার পড়া হয়েছে

গাছ আর মাছ যে এক নয়, সে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? আকাশ ও পাতালের ব্যবধান। ও চলে ঊর্ধ্বমুখে; এ চলে নিম্নে। আরও কত কত ব্যবধান দুইয়ের মধ্যে। বৃক্ষ আমরা রোপণ করি; লালন করি যত্নে। তার সঙ্গে কত মৈত্রী আমাদের! জীবনকেও তো বৃক্ষ বলা হয়েছে। তাকে মনে করা হয়েছে বৃক্ষের মতো সজীব, বিকাশমান, মৈত্রীপ্রবণ, সৌন্দর্যবিলাসী। বৃক্ষপাগলেরা পাগল নয়; বিলাসী। তারা পাত্র নয় পরিহাসের কিংবা করুণার। বরঞ্চ দাবিদার উচ্চ প্রশংসার। বিশেষ করে এ যুগে–অভাব ও লোভের কুঠার যখন অত্যন্ত ব্যস্ত বৃক্ষকে নির্মূল করার কর্তব্যে।

মাছের ব্যাপারটা আলাদা। নিচে থাকে; নিম্নমুখী সে। দেখি না, জানি না। তবে এটা জানি, থাকে সে অন্ধকারে। খায় নানা অখাদ্য। গায়ে তার আঁশটে গন্ধ। পচলে আর রক্ষে নেই। কোথায় ফেলব, কত দ্রুত ফেলব তাই ভেবে অস্থির হই। সৌন্দর্য? আছে বোধ করি। যদি রাখা যায় অ্যাকুয়ারিয়ামে। তার বাইরে কতক্ষণ বাঁচে মাছ যে তার সৌন্দর্য দেখব? সরকারি উদ্যোগে যে মৎস্য পক্ষ উদযাপন চলে, তার পোস্টারে লেখা দেখি দুটি স্লোগান– রুপালি মৎস্য সচ্ছলতার উৎস এবং মৎস্য আইন মেনে চলুন মৎস্য সম্পদ রক্ষা করুন। বক্তব্য দুটি আসলেই ভ্রান্ত। কেননা, মাছ রুপালি কি সোনালি, একি আমাদের দেখবার সময় আছে, সরকার মনে করে? রুপালি কি সোনালি দেখলেও দেখি চকিতে, এক নিমেষে।  আমাদের চোখ থাকে অন্যত্র। সাইজটা কী, ওজনটা কত, ডিম হবে কী হবে না, টাটকা নাকি বাসি এবং দাম কত; কিনতে পারব কি পারব না। সবটাই রসনার সঙ্গে যুক্ত।

ওইখানে মাছের সঙ্গে পাখির ব্যবধান। পাখির সব কিছুই সুন্দর। তার গান, তার ওড়া দুটোকেই ঈর্ষা করি আমরা। যেমন তার গানের গলাকে, তেমনি তার ওড়ার ক্ষমতাকে। আমাদের নেই। আহা, আমরা যদি পাখি হতাম! গান গাইতাম অনন্তকাল ধরে কিংবা উড়ে যেতাম আকাশের পর আকাশ ভেদ করে। মাছকে ঈর্ষা করে কে? সুন্দর চোখের উপমায় পাখি তো আসেই, এমনকি পটোলও আসে। পটোলচেরা চোখ সে কম ব্যাপার নয় সৌন্দর্যশাস্ত্রে। কিন্তু মাছের মতো চোখ? ও বাবা, সে তো ভয়ানক ব্যাপার। সে-চোখ মৃতের কিংবা ভাবলেশহীন নির্বোধের।

একটু সরে এসেছি। ওই যে পাখিতে-পাওয়া, তাই পেয়েছিল আমাকে। মাছে ফেরা যাক। মাছকে বলেছেন রুপালি, সে-বলাটা নাকচ হয়ে গেল। মাছকে বলেছেন সচ্ছলতার উৎস। মিথ্যা কথা। কার জন্য সচ্ছলতা আনছে মাছ? আমরা যারা মৎস্যপ্রিয়, তারা দাম দিতে দিতে অস্থির। জেলেরা পয়সা করছে মাছ বেচে। তাই বুঝি? কই; জেলেপল্লি তো সে-কথা বলে না। সেখানে পয়সার চেয়ে পয়সার অভাব বেশি প্রকট। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তবু একবার খবর নিয়েছিলেন। উপন্যাস লিখে। আমরা খবরও রাখি না– কী তাদের দশা।

আমাদের এক পাঞ্জাবি গভর্নর ছিলেন। পাকিস্তান আমলে। কী বুঝতে কী বুঝলেন, খুব সরগরম করলেন মাঠঘাট– চাষি ভাই, জেলে ভাই বলে। বোধ করি ধারণা হয়েছিল তাঁর যে, আমরা পূর্ববঙ্গীয়রা ওই দুটো জিনিসই বুঝি, ধান ও মাছ। ভাত দাও, মাছ দাও। ব্যস, হয়ে গেল, আর কিছু চাইবে না। তা নিতান্ত মিথ্যা বলেননি। ওরে বাঙালি, তুই তো পুঁটি মাছের কাঙাল। মাছ-ভাতই তোর আদি, অকৃত্রিম ও নির্ভরযোগ্য খাদ্য। ডাল-ভাত একটা রাজনৈতিক আওয়াজ; তাকে যদি বলতে চান ভাঁওতাবাজি তবে তর্ক করব না। দুধ-ভাতের আশা রাখি না, কিংবা তা সন্তানকেই খাওয়ানো যাবে যদি পাই; ডাল-ভাত নয়, মাছ-ভাত দিন, খেয়ে বাঁচি। মাছ কারও সচ্ছলতা আনবে, এ কথা বলবেন না। ধান যেমন কৃষককে ধনী বানায় না, মাছও তেমনি জেলেকে বড়লোক করবে না। কি রাজনীতিতে, কি সমাজে; কৃষকের তুলনায় বহু বহু গুণ উপেক্ষিত হচ্ছে জেলেরা।

আর ওই যে বলা হচ্ছে– মৎস্য আইন মেনে চলুন; এটাও কোনো কার্যকর বক্তব্য নয়। আইনের প্রসঙ্গ উঠলেই বিপদ। লোকে বেআইনিটা করতে প্রমত্ত হবে। আইন দেখলেই লোকে ক্ষেপে যায় দেখেছি। ভাঙার জন্য লাঠিসোটা খোঁজে। আর সম্পদ রক্ষা করা? কার সম্পদ কে রক্ষা করে? সম্পদ মানেই তো ব্যক্তিগত। একের সম্পদ অপরের জন্য বিপদ। এসব ফেলে সোজা কথা বলা ভালো ছিল। সেটা হলো, আমরা মৎস্যনির্ভর। মাছ ছাড়া আমাদের চলে না, চলবে না। আমাদের বাঙালিত্ব, মনুষ্যত্ব সবই যাবে খারিজ হয়ে। অতএব আসুন, চাষ করি মাছের। নিজে বাঁচি, অন্যকে সাহায্য করি বাঁচতে।

 

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সেগুনবাগিচায় শিশুদের বৈশাখী উৎসব; কৃতি শিক্ষার্থী ও সফল মায়েদের হাতে উঠল পুরস্কার!

উত্তেজনা ও মারামারিই যেন আমাদের নিয়তি

আপডেট সময় : ০২:৫০:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫

গাছ আর মাছ যে এক নয়, সে কি আর বলার অপেক্ষা রাখে? আকাশ ও পাতালের ব্যবধান। ও চলে ঊর্ধ্বমুখে; এ চলে নিম্নে। আরও কত কত ব্যবধান দুইয়ের মধ্যে। বৃক্ষ আমরা রোপণ করি; লালন করি যত্নে। তার সঙ্গে কত মৈত্রী আমাদের! জীবনকেও তো বৃক্ষ বলা হয়েছে। তাকে মনে করা হয়েছে বৃক্ষের মতো সজীব, বিকাশমান, মৈত্রীপ্রবণ, সৌন্দর্যবিলাসী। বৃক্ষপাগলেরা পাগল নয়; বিলাসী। তারা পাত্র নয় পরিহাসের কিংবা করুণার। বরঞ্চ দাবিদার উচ্চ প্রশংসার। বিশেষ করে এ যুগে–অভাব ও লোভের কুঠার যখন অত্যন্ত ব্যস্ত বৃক্ষকে নির্মূল করার কর্তব্যে।

মাছের ব্যাপারটা আলাদা। নিচে থাকে; নিম্নমুখী সে। দেখি না, জানি না। তবে এটা জানি, থাকে সে অন্ধকারে। খায় নানা অখাদ্য। গায়ে তার আঁশটে গন্ধ। পচলে আর রক্ষে নেই। কোথায় ফেলব, কত দ্রুত ফেলব তাই ভেবে অস্থির হই। সৌন্দর্য? আছে বোধ করি। যদি রাখা যায় অ্যাকুয়ারিয়ামে। তার বাইরে কতক্ষণ বাঁচে মাছ যে তার সৌন্দর্য দেখব? সরকারি উদ্যোগে যে মৎস্য পক্ষ উদযাপন চলে, তার পোস্টারে লেখা দেখি দুটি স্লোগান– রুপালি মৎস্য সচ্ছলতার উৎস এবং মৎস্য আইন মেনে চলুন মৎস্য সম্পদ রক্ষা করুন। বক্তব্য দুটি আসলেই ভ্রান্ত। কেননা, মাছ রুপালি কি সোনালি, একি আমাদের দেখবার সময় আছে, সরকার মনে করে? রুপালি কি সোনালি দেখলেও দেখি চকিতে, এক নিমেষে।  আমাদের চোখ থাকে অন্যত্র। সাইজটা কী, ওজনটা কত, ডিম হবে কী হবে না, টাটকা নাকি বাসি এবং দাম কত; কিনতে পারব কি পারব না। সবটাই রসনার সঙ্গে যুক্ত।

ওইখানে মাছের সঙ্গে পাখির ব্যবধান। পাখির সব কিছুই সুন্দর। তার গান, তার ওড়া দুটোকেই ঈর্ষা করি আমরা। যেমন তার গানের গলাকে, তেমনি তার ওড়ার ক্ষমতাকে। আমাদের নেই। আহা, আমরা যদি পাখি হতাম! গান গাইতাম অনন্তকাল ধরে কিংবা উড়ে যেতাম আকাশের পর আকাশ ভেদ করে। মাছকে ঈর্ষা করে কে? সুন্দর চোখের উপমায় পাখি তো আসেই, এমনকি পটোলও আসে। পটোলচেরা চোখ সে কম ব্যাপার নয় সৌন্দর্যশাস্ত্রে। কিন্তু মাছের মতো চোখ? ও বাবা, সে তো ভয়ানক ব্যাপার। সে-চোখ মৃতের কিংবা ভাবলেশহীন নির্বোধের।

একটু সরে এসেছি। ওই যে পাখিতে-পাওয়া, তাই পেয়েছিল আমাকে। মাছে ফেরা যাক। মাছকে বলেছেন রুপালি, সে-বলাটা নাকচ হয়ে গেল। মাছকে বলেছেন সচ্ছলতার উৎস। মিথ্যা কথা। কার জন্য সচ্ছলতা আনছে মাছ? আমরা যারা মৎস্যপ্রিয়, তারা দাম দিতে দিতে অস্থির। জেলেরা পয়সা করছে মাছ বেচে। তাই বুঝি? কই; জেলেপল্লি তো সে-কথা বলে না। সেখানে পয়সার চেয়ে পয়সার অভাব বেশি প্রকট। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তবু একবার খবর নিয়েছিলেন। উপন্যাস লিখে। আমরা খবরও রাখি না– কী তাদের দশা।

আমাদের এক পাঞ্জাবি গভর্নর ছিলেন। পাকিস্তান আমলে। কী বুঝতে কী বুঝলেন, খুব সরগরম করলেন মাঠঘাট– চাষি ভাই, জেলে ভাই বলে। বোধ করি ধারণা হয়েছিল তাঁর যে, আমরা পূর্ববঙ্গীয়রা ওই দুটো জিনিসই বুঝি, ধান ও মাছ। ভাত দাও, মাছ দাও। ব্যস, হয়ে গেল, আর কিছু চাইবে না। তা নিতান্ত মিথ্যা বলেননি। ওরে বাঙালি, তুই তো পুঁটি মাছের কাঙাল। মাছ-ভাতই তোর আদি, অকৃত্রিম ও নির্ভরযোগ্য খাদ্য। ডাল-ভাত একটা রাজনৈতিক আওয়াজ; তাকে যদি বলতে চান ভাঁওতাবাজি তবে তর্ক করব না। দুধ-ভাতের আশা রাখি না, কিংবা তা সন্তানকেই খাওয়ানো যাবে যদি পাই; ডাল-ভাত নয়, মাছ-ভাত দিন, খেয়ে বাঁচি। মাছ কারও সচ্ছলতা আনবে, এ কথা বলবেন না। ধান যেমন কৃষককে ধনী বানায় না, মাছও তেমনি জেলেকে বড়লোক করবে না। কি রাজনীতিতে, কি সমাজে; কৃষকের তুলনায় বহু বহু গুণ উপেক্ষিত হচ্ছে জেলেরা।

আর ওই যে বলা হচ্ছে– মৎস্য আইন মেনে চলুন; এটাও কোনো কার্যকর বক্তব্য নয়। আইনের প্রসঙ্গ উঠলেই বিপদ। লোকে বেআইনিটা করতে প্রমত্ত হবে। আইন দেখলেই লোকে ক্ষেপে যায় দেখেছি। ভাঙার জন্য লাঠিসোটা খোঁজে। আর সম্পদ রক্ষা করা? কার সম্পদ কে রক্ষা করে? সম্পদ মানেই তো ব্যক্তিগত। একের সম্পদ অপরের জন্য বিপদ। এসব ফেলে সোজা কথা বলা ভালো ছিল। সেটা হলো, আমরা মৎস্যনির্ভর। মাছ ছাড়া আমাদের চলে না, চলবে না। আমাদের বাঙালিত্ব, মনুষ্যত্ব সবই যাবে খারিজ হয়ে। অতএব আসুন, চাষ করি মাছের। নিজে বাঁচি, অন্যকে সাহায্য করি বাঁচতে।