বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে নিয়ে যাওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে কাজ করছে যুক্তরাজ্য । দুই বছর ধরে এ ব্যাপারে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে দুই দেশ। এ ছাড়া অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধে কাজ চলছে। গতকাল মঙ্গলবার ডিক্যাব টকে এসব কথা বলেছেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক ।
জাতীয় প্রেস ক্লাবে ঢাকার ব্রিটিশ হাইকমিশনারের সঙ্গে এ আয়োজন করে কূটনৈতিক সংবাদদাতাদের সংগঠন ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব)। এতে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন সারাহ কুক। এটি সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সভাপতি এ কে এম মঈনুদ্দিন ও সূচনা বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক ইমরুল কায়েস।
অবৈধভাবে নিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের অর্থ যুক্তরাজ্য ফেরত দেবে কি না– এ প্রশ্নে সারাহ কুক বলেন, ‘সম্পদ পুনরুদ্ধার নিয়ে আমরা কাজ করছি। সুনির্দিষ্ট কোনো মামলা নিয়ে কথা বলতে পারি না। সেগুলোর সব কটিতেই যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বর্তমানে যুক্তরাজ্য ২৫০ মিলিয়ন পাউন্ডের সম্পদ জব্দ করেছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের সঙ্গে কাজ করার প্রতিশ্রুতির এটি অত্যন্ত জোরালো প্রমাণ। এ ছাড়া অবৈধ অর্থের প্রবাহ বন্ধে আমরা কী করতে পারি, তা নিয়েও কাজ করছি।’
অর্থ পাচারে সময় না লাগলেও ফেরত আনতে এত সময় কেন লাগে– এ প্রশ্নে সারাহ কুক বলেন, সম্পদ ফেরত দিতে আইনি প্রক্রিয়ার কারণে সময় লাগে। আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণের ভিত্তি প্রয়োজন হয়। আমরা এটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমাদের মধ্যে, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে প্রযুক্তিগত পর্যায়ে নিয়মিত আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও গণতন্ত্রের গতিপথ প্রসঙ্গে হাইকমিশনার জানান, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত শক্তিশালী অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব রয়েছে। বিগত সময়ে গণতান্ত্রিক সংস্কারে একসঙ্গে কাজ করেছেন। যুক্তরাজ্য নির্বাচন কমিশনকে সমর্থন করেছে এবং আরও অন্যান্য কাজের ক্ষেত্র রয়েছে যেখানে সুশাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারে সমর্থন দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রগুলোতে তারা ভবিষ্যতে একসঙ্গে কাজ করতে চান।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে অনেক কাজ করছি। বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বিডার সঙ্গে কাজ করছি। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্বব্যাপী যা ঘটছে তার দ্বারাও প্রভাবিত। সুতরাং এ পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই একটি চ্যালেঞ্জ। এ কারণেই এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চাই।’
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন করলে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশের জনগণ ভোট দিয়েছেন। সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সংস্কারগুলো ও জুলাই সনদ নিয়ে সর্বোত্তম কর্মপন্থা নির্ধারণের দায়িত্ব সংসদের। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রকাশ্যে মন্তব্য করার কোনো অধিকার নেই। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের সংস্কারের দৃঢ় সমর্থক। এমন সংস্কারের সমর্থক, যা দেশে সুশাসন, মানবাধিকার এবং স্থিতিশীলতা উন্নত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির কারণে কি যুক্তরাজ্য বৈষম্য অনুভব করছে– এ প্রশ্নের উত্তরে সারাহ কুক বলেন, অন্য দেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে মন্তব্য করতে চান না। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব। এ অংশীদারিত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। আরও বেশি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি করতে সহায়তা করতে চান। এটা শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়; যুক্তরাজ্যের ভোক্তাদের জন্যও ভালো। কারণ এর ফলে তারা কম দামে ভালো মানের পণ্য পাওয়ার সুযোগ পান। এটা তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
উন্নয়ন অংশীদাররা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে আনার বিষয়ে কী চিন্তা করছে–এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর স্মৃতি এখনও বেশ তাজা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনও বেশ নাজুক। সরকারি দলের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘সত্য ও নিরাময় কমিশন’ গঠনের অঙ্গীকারকে আমরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। কারণ এটি ন্যায়বিচার, জবাবদিহি এবং পূর্ববর্তী শাসনামলে সংঘটিত নির্যাতনের সত্য উদ্ঘাটনে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে।

বাংলাদেশে মানবাধিকার ও ‘মব’ নিয়ে প্রশ্ন করলে সারাহ কুক বলেন, বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের কাজের অংশ হিসেবে আমরা বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলা চালিয়ে যাব। বাংলাদেশ সরকার আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
২০২৫ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনে দেখা হওয়ার সময় কী আলোচনা হয়েছিল– জানতে চাইলে ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, ‘ব্যক্তিগত বৈঠকের বিষয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয়। তবে অবশ্যই আমরা অংশীদারিত্ব বৃদ্ধি, সম্পর্কের দৃঢ়তা এবং অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোর ওপর যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশ কীভাবে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা করেছি।’
এয়ারবাস বিক্রির অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে হাইকমিশনার বলেন, এটি দুই দেশের সরকারের মধ্যকার চুক্তি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিমান চলাচল খাতে যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যে অংশীদারিত্বকে উন্নত বা শক্তিশালী করা। আঞ্চলিক বিমান চলাচলের একটি কেন্দ্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে বাংলাদেশের। যুক্তরাজ্য সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়তা করতে পারে। তাই সেই চুক্তি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করছেন তারা।
প্রতিনিধির নাম 


















