দুই মাস আগের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় সাদামাটাভাবেই শেষ হলো বগুড়ার উপনির্বাচন ও শেরপুরের একটি আসনের নির্বাচন। কিছু বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও গতকাল বৃহস্পতিবার ভোট গ্রহণ হয়েছে শান্তিপূর্ণ। ভোটার উপস্থিতি ছিল কম। এর মধ্যেও অনিয়মের অভিযোগ তুলে শেরপুর-৩ আসনে ভোট বর্জন করেছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী। বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে শহর ছিল নীরব, শহরতলিতে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশি।
সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ হয়। বিএনপি সরকার গঠনের পর এটিই প্রথম কোনো নির্বাচন। রাতে ঘোষিত বেসরকারি ফল অনুযায়ী বগুড়া-৬ (সদর) আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী রেজাউল করিম বাদশা। ধানের শীষ প্রতীকে তিনি পেয়েছেন এক লাখ ৩৩ হাজার ৯৩১ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের আবিদুর রহমান সোহেল পেয়েছেন ৫৭ হাজার ১৫৯ ভোট। জেলা নিবার্চন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং অফিসার ফজলুল হক এ ফল ঘোষণা করেন।
অন্যদিকে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী) আসনে জয়ী হয়েছেন বিএনপির মাহমুদুল হক রুবেল। তিনি পেয়েছেন এক লাখ ৬৬ হাজার ১১৭ ভোট, তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মাসুদুর রহমান মাসুদ পেয়েছেন ৪৭ হাজার ৫১ ভোট। ভারপ্রাপ্ত নির্বাচন ও রিটার্নিং কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বগুড়া-৬-এ জয়ী হন বিএনপি চেয়ারপারসন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ঢাকা-১৭ রেখে জন্মস্থানের আসনটি তিনি ছেড়ে দিলে গতকাল সেখানে উপনির্বাচন হয়। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে শেরপুর-৩ আসনে ভোট স্থগিত করা হয়েছিল।
শেরপুরে ভোট বর্জন জামায়াতের
বিকেল ৩টার দিকে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন জামায়াতের প্রার্থী মাসুদুর রহমান। ১০-১৫টি ভোটকেন্দ্রে জালভোটের চেষ্টা, এজেন্ট বের করে দেওয়া, হুমকি এবং সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা কর্তৃক ভোটের আগেই ব্যালটের পেছনে সিল ও স্বাক্ষর দেওয়াকে কেন্দ্র করে এ ঘোষণা দেন তিনি।
শ্রীবরদী উত্তর বাজার জামায়াত কার্যালয়ে এ-সংক্রান্ত সংবাদ সম্মেলনে মাসুদুর রহমান বলেন, জালভোটের সঙ্গে জড়িতদের আটক করে প্রিসাইডিং অফিসার ও পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলেও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পরে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ১২৮টি ভোটকেন্দ্রের একটিতেও সিলমারা, কেন্দ্র দখল, ভেতরে বিশৃঙ্খল পরিবেশ হয়েছে– এমন ফুটেজ কিংবা ছবি দেখাতে পারবে না জামায়াত।

বগুড়ায় শহরতলি ছিল সরগরম
বগুড়া-৬ (সদর) আসনের উপনির্বাচনে শহরের কেন্দ্রগুলোতে তেমন ভোটার উপস্থিতি দেখা যায়নি। কেন্দ্রের আশপাশে ছিল না জটলা, দোকানপাট কিংবা নির্বাচনী দিনের স্বাভাবিক আমেজ। তবে শহরতলির কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক বেশি।
সকাল ৮টার পর শহরের করনেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দুই থেকে তিনজন ভোটার। বিকেল ৩টায় প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জানান, ওই কেন্দ্রে ভোট পড়েছে ২৬ শতাংশ। শহরের মালতীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কেন্দ্রে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ২২ শতাংশ।
অন্যদিকে সদরের ঘুনিয়াতলা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে বেলা ১১টা পর্যন্ত ভোট পড়ে প্রায় ২৯ শতাংশ। রাজাপুর ইউনিয়নের কুটুরবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়ে ৩৮ দশমিক ১৯ শতাংশ।
সকাল পৌনে ১০টার দিকে মালতীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের একটি বুথে রেজাল্ট শিটে প্রার্থীর এজেন্টদের স্বাক্ষর নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাসওয়ার তানজামুল হকের উপস্থিতিতে ওই শিট ছিঁড়ে ফেলা হয় এবং নতুন শিট প্রস্তুত করা হয়।
বেলা সাড়ে ১১টায় এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রার্থী অভিযোগ করেন, শুধু মালতীনগর নয়, সিটি স্কুল কেন্দ্রেও একইভাবে আগেভাগে ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর করে রাখা হয়েছে। তিনি রিটার্নিং কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একটি দলকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তোলেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফজলুল করিম বলেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু করতে কমিশন বদ্ধপরিকর। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
সিইসির হস্তক্ষেপ চায় জামায়াত
শেরপুর-৩ ও বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ তুলে গতকাল দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে জামায়াত। এতে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) হস্তক্ষেপ কামনা করেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, সকাল থেকেই বিভিন্ন কেন্দ্রে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে কিছু কেন্দ্রে ভোট শুরুর আগেই প্রিসাইডিং অফিসাররা এজেন্টদের কাছ থেকে ফলাফলের শিটে স্বাক্ষর নিয়েছেন। তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে, সেগুলোর ভোট গ্রহণ স্থগিত করে পুনরায় ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে।
(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধি)।
প্রতিনিধির নাম 









