ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সেগুনবাগিচায় শিশুদের বৈশাখী উৎসব; কৃতি শিক্ষার্থী ও সফল মায়েদের হাতে উঠল পুরস্কার! সকলের কাছে দোয়া চেয়েছেন মটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত সাংবাদিক জাকির হোসেন বাদশা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণে বিএনপির টানা ৮ দিনের কর্মসূচি ৭ বিভাগে বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা জারি এল ক্ল্যাসিকোতে উৎসবের মেজাজে বার্সা নিয়ামতপুরে উন্নয়ন কার্যক্রম ও মানবিক সহায়তায় ব্যস্ত দিন বন্য হাতির তাণ্ডবে রামুতে নিহত মা-মেয়ে পর্নোগ্রাফি মামলায় রাজ-এর আহ্বান, দোষী হলে শাস্তি, নইলে মুক্তি চান চীনের বড় সাফল্য, মিলেছে ২০০টির বেশি নতুন তেল-গ্যাস ক্ষেত্র হাওরে ভয়াবহ ক্ষতি, পানির নিচে ২০০ কোটি টাকার ধান

কৃত্রিম ডিজেল সংকটে বিপাকে কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০২:০৮:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
  • ১৪৯ বার পড়া হয়েছে

কৃত্রিম ডিজেল সংকটে বিপাকে কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

দেশের শস্যভাণ্ডারখ্যাত উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এখন বোরো ধানের মাঠ গাঢ় সবুজে ছেয়ে গেছে। কিন্তু কৃষকের এই রুপালি স্বপ্নে হানা দিয়েছে ডিজেলের ‘কৃত্রিম’ সংকট। ভরা সেচ মৌসুমে যখন চারাগাছের গোড়ায় পানি থাকা অপরিহার্য, তখনই সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার সাঁথিয়া এবং নড়াইল জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র হাহাকার শুরু হয়েছে। কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও তেলের দোকানগুলো সুকৌশলে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই অরাজকতায় সেচ খরচ কয়েক গুণ হওয়ায় বোরো উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সিন্ডিকেটের কবলে ১২ হাজার কৃষক
তাড়াশ উপজেলায় চলতি বছর ২২ হাজার ২০৭ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি ডিজেলচালিত ৪ হাজার ৬১৫টি শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অজুহাতে এখানে স্থানীয় সিন্ডিকেট ডিজেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। সরেজমিন ধামাইচহাট, বিনোদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ তেলের দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। খোলা থাকা দোকানগুলোতে ১০০ টাকার তেল ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সদর বাজারের ব্যবসায়ী মিল্টন খন্দকার দাবি করেন, গত এক সপ্তাহে বাঘাবাড়ী ডিপো থেকে মাঝারি ব্যবসায়ীরা ডিজেল পাননি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু ‘অচেনা লোক’ অতিরিক্ত তেল কেনার ভিড় জমালে বাজার আরও অস্থির হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দিঘীসগুনা বাজারের ব্যবসায়ী সাজু জানান, মজুত শেষ হওয়ায় কাল থেকে হয়তো আর তেলই দিতে পারবেন না। ধামাইচ এলাকার কৃষক বাবুল আক্তারের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল লুকিয়ে ফেলে দোকান বন্ধ রেখেছে, যাতে সংকট তীব্র হলে আরও বেশি দামে বিক্রি করা যায়।

NEWS21
NEWS21

গুড়পিপুল এলাকার কৃষক আল আমিন জানান, তেলের অভাবে সেচ ব্যাহত হওয়ায় লাভের বদলে এখন লোকসানের পাল্লাই ভারি হওয়ার উপক্রম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৪০ টাকায় মিলছে না এক লিটার তেল
পাবনার সাঁথিয়ার চিত্র আরও ভয়াবহ। এখানে ৫ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তেলের অভাবে অনেক জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। আলামিন হোসেন নামে এক কৃষক জানান, বাজারে ১০০ টাকার ডিজেল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবুও চাহিদামতো মিলছে না। শ্যালো মেশিন মালিকরা জানান, প্রতিদিন ১৫-২০ লিটার তেলের প্রয়োজন হলেও পাম্প থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে মাত্র ৫ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। সাঁথিয়া বাজারের ডিলার রবিউল ইসলাম জানান, বাঘাবাড়ী ডিপো থেকে সরবরাহ কম। দাম বেশি হওয়ায় তারা তেল আনতে পারছেন না।

উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে তেল সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো কর্তৃপক্ষ জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী তারা বর্তমানে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করছেন। যমুনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপক আবুল ফজল মো. সাদেকিন জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক পাম্পে সীমিত পরিমাণ জ্বালানির ডিও দেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই রেশনিংয়ের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা মজুতদারি শুরু করেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত সমাধান না হলে বোরোসহ রবি ফসলের উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামবে।

ঋণ করে আবাদ, শূন্য হাতে ফিরছে কৃষক
নড়াইল সদরসহ লোহাগড়া ও কালিয়ায় স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে। সদর উপজেলার বাহির গ্রামের কৃষক শেখর এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিন একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দোকানে ঘুরেও তেল পাচ্ছি না। খালি বোতল নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। জলের অভাবে গাছের গোড়ায় মাটি শুকিয়ে গেছে, লালচে ভাব ধরেছে।’ জেলায় ৫ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তেলের এই সংকট পুরো অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আরিফুর রহমান জানান, তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে।

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সেগুনবাগিচায় শিশুদের বৈশাখী উৎসব; কৃতি শিক্ষার্থী ও সফল মায়েদের হাতে উঠল পুরস্কার!

কৃত্রিম ডিজেল সংকটে বিপাকে কৃষক, বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়

আপডেট সময় : ০২:০৮:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬

দেশের শস্যভাণ্ডারখ্যাত উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এখন বোরো ধানের মাঠ গাঢ় সবুজে ছেয়ে গেছে। কিন্তু কৃষকের এই রুপালি স্বপ্নে হানা দিয়েছে ডিজেলের ‘কৃত্রিম’ সংকট। ভরা সেচ মৌসুমে যখন চারাগাছের গোড়ায় পানি থাকা অপরিহার্য, তখনই সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, পাবনার সাঁথিয়া এবং নড়াইল জেলায় জ্বালানি তেলের তীব্র হাহাকার শুরু হয়েছে। কোথাও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে লিটারপ্রতি ২০ থেকে ৫০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। আবার কোথাও তেলের দোকানগুলো সুকৌশলে বন্ধ রাখা হয়েছে। এই অরাজকতায় সেচ খরচ কয়েক গুণ হওয়ায় বোরো উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সিন্ডিকেটের কবলে ১২ হাজার কৃষক
তাড়াশ উপজেলায় চলতি বছর ২২ হাজার ২০৭ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর জমি ডিজেলচালিত ৪ হাজার ৬১৫টি শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের অজুহাতে এখানে স্থানীয় সিন্ডিকেট ডিজেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে। সরেজমিন ধামাইচহাট, বিনোদপুরসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ তেলের দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। খোলা থাকা দোকানগুলোতে ১০০ টাকার তেল ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

সদর বাজারের ব্যবসায়ী মিল্টন খন্দকার দাবি করেন, গত এক সপ্তাহে বাঘাবাড়ী ডিপো থেকে মাঝারি ব্যবসায়ীরা ডিজেল পাননি। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কিছু ‘অচেনা লোক’ অতিরিক্ত তেল কেনার ভিড় জমালে বাজার আরও অস্থির হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দিঘীসগুনা বাজারের ব্যবসায়ী সাজু জানান, মজুত শেষ হওয়ায় কাল থেকে হয়তো আর তেলই দিতে পারবেন না। ধামাইচ এলাকার কৃষক বাবুল আক্তারের অভিযোগ, অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল লুকিয়ে ফেলে দোকান বন্ধ রেখেছে, যাতে সংকট তীব্র হলে আরও বেশি দামে বিক্রি করা যায়।

NEWS21
NEWS21

গুড়পিপুল এলাকার কৃষক আল আমিন জানান, তেলের অভাবে সেচ ব্যাহত হওয়ায় লাভের বদলে এখন লোকসানের পাল্লাই ভারি হওয়ার উপক্রম। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

১৪০ টাকায় মিলছে না এক লিটার তেল
পাবনার সাঁথিয়ার চিত্র আরও ভয়াবহ। এখানে ৫ হাজার ৬০৪ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তেলের অভাবে অনেক জমি ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। আলামিন হোসেন নামে এক কৃষক জানান, বাজারে ১০০ টাকার ডিজেল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবুও চাহিদামতো মিলছে না। শ্যালো মেশিন মালিকরা জানান, প্রতিদিন ১৫-২০ লিটার তেলের প্রয়োজন হলেও পাম্প থেকে রেশনিং পদ্ধতিতে মাত্র ৫ লিটার করে তেল দেওয়া হচ্ছে। সাঁথিয়া বাজারের ডিলার রবিউল ইসলাম জানান, বাঘাবাড়ী ডিপো থেকে সরবরাহ কম। দাম বেশি হওয়ায় তারা তেল আনতে পারছেন না।

উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে তেল সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ী অয়েল ডিপো কর্তৃপক্ষ জানায়, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নির্দেশনা অনুযায়ী তারা বর্তমানে ‘রেশনিং’ পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ করছেন। যমুনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপক আবুল ফজল মো. সাদেকিন জানান, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক পাম্পে সীমিত পরিমাণ জ্বালানির ডিও দেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই রেশনিংয়ের সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা মজুতদারি শুরু করেছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, দ্রুত সমাধান না হলে বোরোসহ রবি ফসলের উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নামবে।

ঋণ করে আবাদ, শূন্য হাতে ফিরছে কৃষক
নড়াইল সদরসহ লোহাগড়া ও কালিয়ায় স্থানীয় চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় লাগামহীন হয়ে পড়েছে। সদর উপজেলার বাহির গ্রামের কৃষক শেখর এক লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিন একর জমিতে বোরো চাষ করেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দোকানে ঘুরেও তেল পাচ্ছি না। খালি বোতল নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। জলের অভাবে গাছের গোড়ায় মাটি শুকিয়ে গেছে, লালচে ভাব ধরেছে।’ জেলায় ৫ হাজার ৩০৯ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও তেলের এই সংকট পুরো অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আরিফুর রহমান জানান, তারা মাঠ পর্যায়ে তদারকি করছেন এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হচ্ছে।