কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজানের ঢলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের হাওরাঞ্চলের প্রায় এক হাজার বিঘা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, আগামী দুই থেকে তিনদিন পানি বাড়তে থাকলে আরও অন্তত চার থেকে পাঁচ হাজার বিঘা জমির ধান তলিয়ে যেতে পারে। এতে বর্গাচাষি ও ঋণগ্রস্ত কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
এদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে আগাম বন্যার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় নাসিরনগরেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকদের একটাই প্রশ্ন, ‘ধান কি ঘরে তুলতে পারব?’

নাসিরনগর উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া তথ্য মতে প্রায় এক হাজার বিঘা পাকা জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
স্থানীয় কৃষি অফিস বার বার পাকা ধান কেটে নিতে বললেও কৃষক জমিতে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কৃষদের ভাষ্য, এক বিঘা জমি আবাদে যে খরচ হয়েছে, বর্তমানে বাজারদরে ধান বিক্রি করলে লোকসান গুনতে হবে। পাশাপাশি বৃষ্টির সময় বজ্রপাতের আশঙ্কায় মাঠে যেতে ভয় পাচ্ছেন তারা। ফলে সময়মতো ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় মোট কৃষকের সংখ্যা প্রায় ৫১ হাজার। এ বছর প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয়েছে প্রায় ১২ হাজার হেক্টর। যার ৬০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪০ শতাংশের মধ্যে ব্রি ধান ২৯, ব্রি-১০০, ব্রি-৯২, ব্রি-১০২ ও ব্রি-১০৮ ব্রি-৫৮ এখনো কাটা বাকি আছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মেদিনীর হাওরের বিস্তীর্ণ ক্ষেতজুড়ে পাকা বোরো ধানের শীষ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও শুধু ধানের ছড়ার মাথা সামান্য ভেসে আছে, তার উপর দিয়েই বয়ে যাচ্ছে পানির স্রোত। হালকা বাতাসে ঢেউ উঠছে, আর সেই ঢেউয়ের সাথে দুলছে তলিয়ে যাওয়া ধানের গাছ।
কিছু কিছু জায়গায় দেখা যায়, কৃষকরা কোমর সমান পানির মধ্যেই ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কোমর সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাস্তে চালাচ্ছেন তারা। কিন্তু ভেজা ধান কাটা যেমন কঠিন, তেমনি সংরক্ষণ করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসময় কথা হয় কৃষক জয়নাল খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘যদি আর দুইডা দিন সময় পায়তাম তাইলে আমার পাকা খেতটা কাইট্যা ঘরে নিতে পারতাম। এখন সব শেষ। ত্রিশ হাজার টাকা ঋণ আইন্যা দুই কানি (বিঘা) জমি করছি। এখনতো ঘরের খাবারই পাইতামনা, কিস্তি দিমু কেমনে।’
জানা যায়, গত রোববার থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে লঙ্গন, বেমালিয়া, মেঘনা ও ধলেশ্বরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। নদীর তীর ঘেঁষা হাওরে পানি প্রবেশ করলে মুহূর্তেই এসব জমির পাকা ধান তলিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা।
বুড়িশ্বর ইউনিয়নের কৃষক খালেক চোখের জল মুছতে মুছতে বলেন, ‘সকালে আইছি ধান কাটতাম। ক্ষেত দেখছি শুকনা। এক ঘণ্টার মধ্যেই দেহি ক্ষেতে কোমর পানি। সব ধান ডুইব্যা গেছে। ব্রাক থেইক্যা এক লাখ টাকা ঋণ নিছি। এখন ঋণ দিমু কেমনে, আর পোলা মাইয়া লইয়া ভাত খামু কেমনে।’
কৃষক মাহফুজ মিয়া বলেন, ‘মেদিনির হাওরের লুঙ্গা (ডুবো এলাকা) প্রায় তিন থেকে চারশ বিঘা জমি এক সপ্তাহ আগেই পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই এলাকায় আমার ১৪ বিঘা জমি আছিল। যার সবই পানির নিচে। ভাবছিলাম পানি কমলে ধান কাটুম কিন্তু পানি কমার কোন আলামত দেখছিনা।’
স্থানীয়দের দাবি, কিশোরগঞ্জ জেলার অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন এলাকায় হাওরের জমির উপর দিয়ে পাকা সড়ক নির্মাণের ফলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর ও সরাইলের হাওরের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ হয়না। যার ফলে নাসিরনগরের মতো নিচু এলাকায় অল্প পানিতে ডুবে যাচ্ছে। আবার মাঝে মধ্যে হাওরে পানিই আসে না। ফলে কৃষি ও মৎস্য মারাত্মকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে।
উপজেলার সদর ইউনিয়নের পশ্চিম পাড়ার কৃষক জহির মিয়ার অভিযোগ, অষ্টগ্রামের হাওরে রাস্তা করার পর থেকে আমাদের হাওরের পানির আগের গতি নাই। কখনো পানি পাই না, আবার পানি আসলেই বাড়ি-ঘরসহ হাওর ডুবে যায়।
৮০ বছরের বৃদ্ধ কৃষক হাসান মিয়া বলেন, ‘আমাদের হাওরে এই সময় পানি আসার কথা না। জোয়ারের পানির কারণে পাকা ধান তলাই গেছে কোনদিন দেখিনাই। কিন্তু কিশোরগঞ্জের হাওরে নতুন রাস্তা নির্মাণের পর থেইক্যা আস্তে আস্তে আমাদের হাওরে পানি দেখা যাইতেছে।’
এলাকাবাসী জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বড় অংশই এনজিও ঋণের ওপর নির্ভর করে জমি চাষ করেছেন। আবার অনেকেই আছেন বর্গা চাষি। ফলে ফসল হারানোর সাথে সাথে ঋণ পরিশোধ নিয়ে চরম অনিশ্চিয়তায় পড়েছেন প্রান্তিক কৃষক পরিবারগুলো।
কৃষক প্রাণ গোপাল দাস বলেন, আট বিঘা জমি চাষ করছি এনজিও থেকে লাখ টাকা ঋণ নিয়া। সাত বিঘা জমি পানির নিচে। কিস্তি দিতে না পারলে থাকার ঘরটা বেইচ্যা দেওন লাগব।
গোয়ালনগরের কৃষক রহমান ভূঁইয়া বলেন, আমার নিজের জমি নাই। তিন বিঘা জমি বর্গা চাষ করছি। জমি চাষের আগেই ১৫ হাজার টাকা জমির মালিকরে দিয়া দিসি। এখন সব জমি পানির নিচে তলাই গেছে। পরিবার নিয়া কেমনে বাকি দিন চলুম।
উপজেলা কৃষি অফিসার ইমরান সাকিল বলেন, গত দুই দিন ধরে আমি গোয়ালনগর, নাসিরনগর ও বুড়িশ্বর ইউনিয়নের বিভিন্ন ফসলি জমি ঘুরে দেখেছি। টানা বৃষ্টির কারণে হাওরে পানি বেড়ে যাওয়ায় পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যদি পানি দ্রুত সরে যায় তাহলে ধান ঘরে তুলতে পারবে কৃষক। পানি সরে না গেলে তাদের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, সরকার ধানে ন্যায্য দাম দিয়েছে।
প্রতিনিধির নাম 


















