ঢাকা ০৬:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬, ৮ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চমক, নবীনদের দৌড়ে পেছনে পরিচিত মুখ

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চমক, নবীনদের দৌড়ে পেছনে পরিচিত মুখ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ২৬ জন প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন। জায়গা পাননি আলোচনায় থাকা কয়েকজন নেত্রী।

গতকাল সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ মঙ্গলবার দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন জমা দেওয়া হবে।

আগামী ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হবে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। প্রতি ৬ জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। সে অনুযায়ী, বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে ১টি সংরক্ষিত আসন পাবে।

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে এবার ১০ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। তারা হলে–বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা, সহপ্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রেহেনা আক্তার রানু, কেন্দ্রীয় নেত্রী নেওয়াজ হালিমা আরলী, বিলকিস ইসলাম, শাম্মী আক্তার, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি ও সুলতানা আহমেদ।

মনোনয়নের তালিকায় নতুন করে স্থান পেয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, বিএনপি সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে শাকিলা ফারজানা, প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন।

এছাড়া ফরিদা ইয়াসমিন, জীবা আমিন খান, মোছা. সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা, সেলিনা সুলতানা ও রেজেকা সুলতানাকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

NEWS21
NEWS21

দুই পরিবারে একাধিক সদস্য
তালিকায় থাকা দুজনকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। তাদের একজন নিপুণ রায় চৌধুরী। তাঁর বাবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শ্বশুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

নিপুণ রায় চৌধুরী পেশাগতভাবে একজন আইনজীবী হলেও পারিবারিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ শাখা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে।

আরেকজন শিরিন সুলতানা। তাঁর স্বামী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন এমপি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল সাবেক এই ছাত্রদল নেত্রীর। তিনি ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ষষ্ঠ জাতীয় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।

নির্বাচনে পরাজিত তিনজন সংরক্ষিত আসনে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৯ জন নারী প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করেন। তাদের মধ্যে শেরপুর-১ আসনে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা, ঢাকা-১৪ আসনে মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি পরাজিত হন। সংরক্ষিত নারী আসনে তিনজনই মনোনীত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নেত্রীও মনোনয়ন পেয়েছেন
সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সুবর্ণা ঠাকুর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ড. কাজী মনিরুজ্জামান সমকালকে জানান, গত বছরের অক্টোবরে মতুয়া সংগঠনের ব্যানারে সুবর্ণা ঠাকুর বিএনপিতে যোগদান করেন। এই মতুয়া সংগঠন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুইজনকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি।

পার্বত্য অঞ্চল থেকে মনোনীত অ্যাডভোকেট মাধবী মারমাকে নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি মাধবী মারমার আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা আওয়ামী লীগের আমলে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরের (এপিপি) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না কিংবা কোনো পদপদবিও ছিল না বলে জানা গেছে

নেতাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে আরও যারা মনোনয়ন পেয়েছেন
বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরউদ্দিন আহমদ পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, শেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীর মেয়ে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা এবং মৌলভীবাজারের বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে জহরত আবিদ চৌধুরী। তিনি স্থানীয় বিএনপির নেত্রী।
দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন, তবে সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন আন্না মিনজ। তিনি ওঁরাও জনগোষ্ঠী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আন্না মিনজ বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট জন গমেজের সহধর্মিণী। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক (প্রোগ্রাম) হিসেবে কর্মরত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, কৃষি, লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা খাতে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করছেন।

আলোচিত যারা মনোনয়ন পাননি
মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমেদের সহধর্মিণী হাসনা জসীম উদ্‌দীন মওদুদ, সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগম, প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম আরুণি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী এবং সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী শাহিনুর নার্গিস, নাসিমা আক্তার (কেয়া), তামান্না খান আইরিন, শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, টাঙ্গাইল মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাহেলা জাকির, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নিহার সুলতানা তিথিসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খানের নাম আলোচনায় ছিল। তবে তারা মনোনয়ন পাননি।

সংস্কৃতি জগতের কেউ নেই
সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা,  রিজিয়া পারভীন, নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, মডেল মেঘনা আলম ও রুকাইয়া জাহান চমক। রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন তালিকায় জায়গা পাননি।

এর মধ্যে শিল্পী কনকচাঁপা ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন। এবার তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া না হলেও নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন– সংরক্ষিত আসনে তিনি এমপি হবেন। তবে মনোনয়ন ঘোষণার পর কনকচাঁপা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। জাতীয় নির্বাচনে নমিনেশন না পেয়েও আলহামদুলিল্লাহ বলেছি নির্দ্বিধায়। গ্রামের মানুষের প্রবল চাহিদার জন্য আবারও গেলাম সংরক্ষিত আসনের এই প্রসেসে। সেখানেও তারা আমাকে মূল্যায়ন করল না। তবু বলি আলহামদুলিল্লাহ। নিশ্চয়ই আল্লাহ এর মধ্যে মঙ্গল রেখেছেন। জীবন তো এখানেই শেষ হয়ে গেল না।’

কনকচাঁপার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের দিন বগুড়ার বিএনপি নেত্রী সুরাইয়া জেরিন রনি নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। আন্দোলনে থাকা নেত্রীদের মূল্যায়নের দাবি ছিল তাঁর। তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন।

ছাত্রদলের মানসুরা ও তুলির চমক
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে চমক দেখিয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তার ও সানজিদা ইয়াসমিন তুলি। মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্য মানসুরা সর্বকনিষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থী বিগত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সদস্য সচিব তুলিও আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখ সারিতে ছিলেন।
ওই দুই নেত্রী ছাড়াও ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়ার মনোনয়ন পেয়েছেন আরও চার তরুণ নারী নেত্রী। এদের উত্থানকে দলীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চারজন হলেন— সেলিনা সুলতানা, আরিফা সুলতানা, শওকত আরা উর্মি ও নাদিয়া পাঠান পাপন।

তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মনোনয়নের তালিকায়
টেলিভিশন টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র উপস্থাপক ও পরিচালক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হককে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ফাহমিদা হক একজন গবেষক এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

স্বতন্ত্র জোটে মনোনয়ন পেলেন ছাত্রদল নেত্রী জুঁই
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র ছয় এমপির জোট থেকে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সুলতানা জেসমিন জুঁইকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র এমপি শেখ মজিবর রহমান ইকবাল এবং ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মোহাম্মদ সালমান ওমর জুঁইয়ের মনোনয়নে স্বাক্ষর করেছেন। স্বতন্ত্র এমপিদের জোটের সবাই বিএনপির নেতা ছিলেন।

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির চমক, নবীনদের দৌড়ে পেছনে পরিচিত মুখ

আপডেট সময় : ০৩:১৩:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য ৩৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি। এর মধ্যে ২৬ জন প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন। জায়গা পাননি আলোচনায় থাকা কয়েকজন নেত্রী।

গতকাল সোমবার নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলন মনোনীতদের নাম ঘোষণা করেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ মঙ্গলবার দলের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়ন জমা দেওয়া হবে।

আগামী ১২ মে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন হবে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৫০টি। প্রতি ৬ জন সাধারণ সদস্যের বিপরীতে একটি সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন হবে। সে অনুযায়ী, বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা মিলে ১টি সংরক্ষিত আসন পাবে।

বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্যদের মধ্যে এবার ১০ জনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। তারা হলে–বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, কেন্দ্রীয় কমিটির স্বনির্ভরবিষয়ক সম্পাদক শিরীন সুলতানা, প্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রাশেদা বেগম হীরা, সহপ্রশিক্ষণবিষয়ক সম্পাদক রেহেনা আক্তার রানু, কেন্দ্রীয় নেত্রী নেওয়াজ হালিমা আরলী, বিলকিস ইসলাম, শাম্মী আক্তার, হেলেন জেরিন খান, নিলোফার চৌধুরী মনি ও সুলতানা আহমেদ।

মনোনয়নের তালিকায় নতুন করে স্থান পেয়েছেন ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নিপুণ রায় চৌধুরী, বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য মাহমুদা হাবিবা, মায়ের ডাক-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, বিএনপি সাবেক হুইপ সৈয়দ ওয়াহিদুল আলমের মেয়ে শাকিলা ফারজানা, প্রয়াত শফিউল বারী বাবুর স্ত্রী বীথিকা বিনতে হোসাইন।

এছাড়া ফরিদা ইয়াসমিন, জীবা আমিন খান, মোছা. সাবিরা সুলতানা, সানসিলা জেবরিন, ফাহমিদা হক, আন্না মিনজ, সুবর্ণা সিকদার (ঠাকুর), শামীম আরা বেগম স্বপ্না, মোছা. সুরাইয়া জেরিন, মানসুরা আক্তার, জহরত আদিব চৌধুরী, মমতাজ আলো, ফাহিমা নাসরিন, আরিফা সুলতানা, মোছা. সানজিদা ইয়াসমিন, নাদিয়া পাঠান পাপন, শওকত আরা আক্তার, মাধবী মার্মা, সেলিনা সুলতানা ও রেজেকা সুলতানাকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি।

NEWS21
NEWS21

দুই পরিবারে একাধিক সদস্য
তালিকায় থাকা দুজনকে নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা আছে। তাদের একজন নিপুণ রায় চৌধুরী। তাঁর বাবা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শ্বশুর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৩ আসনের সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

নিপুণ রায় চৌধুরী পেশাগতভাবে একজন আইনজীবী হলেও পারিবারিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের কারণে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য, নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব এবং দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ শাখা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকার জন্য তাঁকে একাধিকবার কারাগারে যেতে হয়েছে।

আরেকজন শিরিন সুলতানা। তাঁর স্বামী বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবীর খোকন এমপি। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা ছিল সাবেক এই ছাত্রদল নেত্রীর। তিনি ঢাকা মহানগর মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ষষ্ঠ জাতীয় সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন।

নির্বাচনে পরাজিত তিনজন সংরক্ষিত আসনে
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ৯ জন নারী প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ভোট করেন। তাদের মধ্যে শেরপুর-১ আসনে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াংকা, যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা, ঢাকা-১৪ আসনে মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি পরাজিত হন। সংরক্ষিত নারী আসনে তিনজনই মনোনীত হয়েছেন।

আওয়ামী লীগ নেত্রীও মনোনয়ন পেয়েছেন
সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া সুবর্ণা ঠাকুর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন।

কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ড. কাজী মনিরুজ্জামান সমকালকে জানান, গত বছরের অক্টোবরে মতুয়া সংগঠনের ব্যানারে সুবর্ণা ঠাকুর বিএনপিতে যোগদান করেন। এই মতুয়া সংগঠন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুইজনকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি।

পার্বত্য অঞ্চল থেকে মনোনীত অ্যাডভোকেট মাধবী মারমাকে নিয়ে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি মাধবী মারমার আওয়ামী সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
অ্যাডভোকেট মাধবী মারমা আওয়ামী লীগের আমলে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটরের (এপিপি) দায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না কিংবা কোনো পদপদবিও ছিল না বলে জানা গেছে

নেতাদের স্ত্রী-সন্তানদের মধ্যে আরও যারা মনোনয়ন পেয়েছেন
বিএনপির প্রয়াত নেতা নাসিরউদ্দিন আহমদ পিন্টুর বোন ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ফেরদৌসী আহমেদ, শেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হযরত আলীর মেয়ে ডা. সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা এবং মৌলভীবাজারের বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর মেয়ে জহরত আবিদ চৌধুরী। তিনি স্থানীয় বিএনপির নেত্রী।
দলের সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন, তবে সংরক্ষিত কোটায় মনোনয়ন পেয়েছেন আন্না মিনজ। তিনি ওঁরাও জনগোষ্ঠী ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। আন্না মিনজ বিএনপি কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্মবিষয়ক সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট জন গমেজের সহধর্মিণী। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক (প্রোগ্রাম) হিসেবে কর্মরত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, কৃষি, লিঙ্গ সমতা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা খাতে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পরিচালিত কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করছেন।

আলোচিত যারা মনোনয়ন পাননি
মহিলা দলের সভানেত্রী আফরোজা আব্বাস, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া, মহিলা দলের সহসভাপতি নাজমুন নাহার বেবী, প্রয়াত নেতা মওদুদ আহমেদের সহধর্মিণী হাসনা জসীম উদ্‌দীন মওদুদ, সাবেক কাউন্সিলর সুরাইয়া বেগম, প্রয়াত মহাসচিব আবদুস সালাম তালুকদারের মেয়ে ব্যারিস্টার সালিমা বেগম আরুণি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী এবং সাবেক এমপি মকবুল হোসেনের মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেন, ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী শাহিনুর নার্গিস, নাসিমা আক্তার (কেয়া), তামান্না খান আইরিন, শামসুন্নাহার ভূঁইয়া, টাঙ্গাইল মহিলা দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রাহেলা জাকির, ফটিকছড়ির গুম হওয়া বিএনপি নেতা শহিদুল আলম সিরাজের সহধর্মিণী সুলতানা পারভীন, বগুড়া জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক নিহার সুলতানা তিথিসহ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খানের মেয়ে মাহরীন খানের নাম আলোচনায় ছিল। তবে তারা মনোনয়ন পাননি।

সংস্কৃতি জগতের কেউ নেই
সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছিলেন সংগীতশিল্পী বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা,  রিজিয়া পারভীন, নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী, মডেল মেঘনা আলম ও রুকাইয়া জাহান চমক। রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন তালিকায় জায়গা পাননি।

এর মধ্যে শিল্পী কনকচাঁপা ২০১৮ সালে বিএনপির মনোনয়নে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচন করেছিলেন। এবার তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া না হলেও নেতাকর্মীরা মনে করেছিলেন– সংরক্ষিত আসনে তিনি এমপি হবেন। তবে মনোনয়ন ঘোষণার পর কনকচাঁপা ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ। জাতীয় নির্বাচনে নমিনেশন না পেয়েও আলহামদুলিল্লাহ বলেছি নির্দ্বিধায়। গ্রামের মানুষের প্রবল চাহিদার জন্য আবারও গেলাম সংরক্ষিত আসনের এই প্রসেসে। সেখানেও তারা আমাকে মূল্যায়ন করল না। তবু বলি আলহামদুলিল্লাহ। নিশ্চয়ই আল্লাহ এর মধ্যে মঙ্গল রেখেছেন। জীবন তো এখানেই শেষ হয়ে গেল না।’

কনকচাঁপার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের দিন বগুড়ার বিএনপি নেত্রী সুরাইয়া জেরিন রনি নয়াপল্টন কার্যালয়ের সামনে ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। আন্দোলনে থাকা নেত্রীদের মূল্যায়নের দাবি ছিল তাঁর। তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন।

ছাত্রদলের মানসুরা ও তুলির চমক
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়ে চমক দেখিয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মানসুরা আক্তার ও সানজিদা ইয়াসমিন তুলি। মনোনয়নপ্রাপ্তদের মধ্য মানসুরা সর্বকনিষ্ঠ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থী বিগত আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। অন্যদিকে ইডেন কলেজ ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সদস্য সচিব তুলিও আন্দোলন-সংগ্রামে সম্মুখ সারিতে ছিলেন।
ওই দুই নেত্রী ছাড়াও ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতা নিয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়ার মনোনয়ন পেয়েছেন আরও চার তরুণ নারী নেত্রী। এদের উত্থানকে দলীয় রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের অগ্রযাত্রা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই চারজন হলেন— সেলিনা সুলতানা, আরিফা সুলতানা, শওকত আরা উর্মি ও নাদিয়া পাঠান পাপন।

তৃতীয় মাত্রার উপস্থাপক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী মনোনয়নের তালিকায়
টেলিভিশন টকশো ‘তৃতীয় মাত্রা’র উপস্থাপক ও পরিচালক জিল্লুর রহমানের স্ত্রী ফাহমিদা হককে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ফাহমিদা হক একজন গবেষক এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের সঙ্গেও সম্পৃক্ত।

স্বতন্ত্র জোটে মনোনয়ন পেলেন ছাত্রদল নেত্রী জুঁই
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র ছয় এমপির জোট থেকে ছাত্রদলের সাবেক নেত্রী সুলতানা জেসমিন জুঁইকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের স্বতন্ত্র এমপি শেখ মজিবর রহমান ইকবাল এবং ময়মনসিংহ-১ আসনের স্বতন্ত্র এমপি মোহাম্মদ সালমান ওমর জুঁইয়ের মনোনয়নে স্বাক্ষর করেছেন। স্বতন্ত্র এমপিদের জোটের সবাই বিএনপির নেতা ছিলেন।