শুক্রবার বিকেল ৩টা ৫২ মিনিট। সৌদি আরবের মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশনে ঢুকলেন দুই বাংলাদেশি মুতামির (ওমরাহ পালনকারী)। একজন রাজশাহীর মো. আজাদ, অন্যজন মুন্সীগঞ্জের রিয়াজুল হায়দার। দুজনেরই দেশে ফেরার কথা শনিবার। কিন্তু এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় তারা দেশে ফিরতে পারেননি।
এখন তাদের হাতে টাকা নেই, দেশে ফেরার টিকিটও নেই। থাকা-খাওয়া নিয়ে সংকটে পড়েছেন। নতুন করে টিকিট কাটতে এজেন্সি মালিক ৫০-৬০ হাজার টাকা চাচ্ছেন।
কামরুল ইসলাম জানান, মুতামিররা হোটেল বিল দিতে পারছেন না। অনেকের খাবার খাওয়ার টাকা নেই। এমন নানা রকম সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশ হজ মিশনে আসছেন তারা। অভিযোগ শুনে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির মালিককে ফোন করে অভিযোগ সমাধানের চেষ্টা করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘এ সংকটে দেশে যাওয়ার জন্য যাত্রীদের কেন নতুন টিকিটের পুরো টাকা দিতে হবে? সেটাই ট্রাভেল এজেন্সিগুলোর মালিকদের বলছি। অনেক মালিক সহযোগিতা করছেন।’
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ফ্লাইট বা টিকিট বাতিল হলে এয়ারলাইন্সগুলো টাকা ফেরত দেয়। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ফ্লাইট বাতিলের কারণে আটকে পড়া যাত্রীদের আপাতত নতুন টিকিট কিনেই ফিরতে হবে। তবে ফ্লাইট যাদের চালু আছে, তাদের নতুন করে টিকিট কিনতে হবে না।
মক্কায় হজ মিশনে প্রতিদিন বাংলাদেশি ভিড় করছেন। গত শুক্রবার মুতামির মো. আজাদ জানান, দেড় লাখ টাকা দিয়ে ওমরাহ পালন করতে গত ২২ ফেব্রুয়ারি সৌদি আরবে আসেন। ফিরে যাওয়ার কথা ৭ মার্চ। যুদ্ধ বাধায় এয়ার অ্যারাবিয়ার ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায়। এখন দেশে ফিরতে নতুন করে টিকিট কিনতে ৫০ হাজার টাকা চাইছে ট্রাভেল এজেন্সি। তিনি গরিব মানুষ। তাঁর কাছে বোনো টাকা নেই। খাবেন কী, থাকবেন কোথায়, কিছু জানেন না। প্যাকেজ শেষ হওয়ায় থাকা-খাওয়া, টিকিটের দায়িত্ব আর নিচ্ছে না এজেন্সি। চোখমুখে অন্ধকার দেখছেন। তাঁর সঙ্গে আসা ১০ জন মুতামিরের একই অবস্থা।
আরেক মুতামির রিয়াজুল হায়দার বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে নিজ খরচে হোটেল, থাকা-খাওয়া ও টিকিটের ব্যবস্থা করেছি। ট্রাভেল এজেন্সি কোনো কিছুর ব্যবস্থা করেনি। এখন ইন্ডিগো করে কলকাতা যাব। সেখান থেকে দেশে ফিরব।’
গত শনিবার দুপুর ২টায় মক্কার মিশফালাহ খুপড়ির পাশের বাংলাদেশ হজ মিশনে গিয়ে দেখা মেলে মো. দিদার, সাইফুল হক ও ছিদ্দিক আহমদের। তারা জানান, নারায়ণগঞ্জ থেকে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে আসেন। তাদের দেশে ফেরার এমিরেটসের ৩ মার্চের টিকিট বাতিল। প্রত্যেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্যাকেজে মক্কায় আসেন। গত এক সপ্তাহে তাদের নিজ খরচে হোটেলে থাকা-খাওয়া হচ্ছে। ট্রাভেল এজেন্সি কোনো খবর নিচ্ছে না। প্রতিদিন হোটেলে ৪০০ রিয়েল ভাড়া, খাওয়ার বিল, একই সঙ্গে নতুন করে টিকিট কিনে দেশে ফিরতে হবে। যুদ্ধ তাদের দুর্ভোগ ও বাড়তি ব্যয়ের বোঝা তুলে দিচ্ছে। তাদের হোটেলে আটকে পড়া আরও ২৭ জন ওমরাহ যাত্রী অনিশ্চয়তা, আতংক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
একটি সূত্র জানায়, আগের করা টিকিট বাতিল হওয়ায় কাউকে ৫০ হাজার, কাউকে ৬০ হাজার টাকা অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। এ হিসাবে সাড়ে তিন হাজার যাত্রীকে অন্তত ১৮ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ওমরাহ ও হজ ট্রাভেল এজেন্সিগুলো মুতামিরদের কোনো আর্থিক সহযোগিতা করছে না।

এক প্রশ্নের জবাবে মক্কার বাংলাদেশ হজ মিশনের প্রধান কনসাল কামরুল ইসলাম বলেন, আটকে পড়াদের দেশে পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করে বিমানের দুটি বিশেষ ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বিশেষ ফ্লাইটের অনুমতিও মিলেছিল। কিন্তু দেশ থেকে খালি এসে জেদ্দা থেকে ওমরাহ যাত্রী নিয়ে যেতে প্রতি টিকিটের খরচ পড়বে লাখ টাকা। খরচ বেশি হওয়ায় শেষ মুহূর্তে বিশেষ ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এখন যেসব নিয়মিত ফ্লাইট আছে, সেখানে খালি থাকা টিকিট ৫০-৬০ হাজার টাকার মধ্যে কেটে আটকে পড়া যাত্রীদের পর্যায়ক্রমে দেশে যেতে হচ্ছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান-ইসরায়েল ও আমেরিকা যুদ্ধ শুরু হয়। এর আগে বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালন করতে মক্কায় আসেন বহু ব্যক্তি। সব উড়োজাহাজ সংস্থা তাদের ফ্লাইট বন্ধ রেখেছে। ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় সবাই বিপাকে পড়েছেন। অর্থ সংকটে তারা দিশেহারা। নতুন করে দেশে ফেরার টিকিট কিনতে ৫০-৬০ হাজার টাকা ট্রাভেল এজেন্সির হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। মক্কা-মদিনায় বসে দেশে স্বজনদের কাছে ফোন করে আকুতি-মিনতি করছেন অনেকে। অনেককে ৫০-৬০ হাজার টাকা সংগ্রহ করতে কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে। যারা টাকা দিতে পারছেন, তাদের চালু থাকা এয়ারলাইন্স থেকে টিকিট ম্যানেজ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিমান, ইউএস-বাংলা, সালাম এয়ারে পর্যাপ্ত টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক বাংলাদেশি ভারতের ইন্ডিগো এয়ারে কলকাতা ট্রানজিট করে ঢাকা-চট্টগ্রামে ফিরছেন বলে মক্কায় বাংলাদেশ হজ মিশন সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিনিধির নাম 















