পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী আবহাওয়ায় মধ্যেই বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার। বাংলাদেশে ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত হচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সংসদ ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদী। বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মার জায়গায় এই দায়িত্ব পেতে চলেছেন দীনেশ।
বর্তমানে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মাকে ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠানো হচ্ছে। তার জায়গাতেই দায়িত্ব নেবেন ৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক। যদিও এ বিষয়ে কেন্দ্রের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু ঘোষণা করা হয়নি। তবে সংবাদমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে, বাংলায় বিধানসভা নির্বাচনের পরেই দীনেশকে রাষ্ট্রদূত করে বাংলাদেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে।
বিএনপির তারেক রহমান সরকারের আমলে ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নতি হচ্ছে ধীরে ধীরে। এই অবস্থায় ‘বাংলাভাষী’ একজন রাজনীতিবিদকে দিল্লির দূত করা তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
আদতে গুজরাটি ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে হলেও ঝরঝরে বাংলা বলতে পারেন দীনেশ ত্রিবেদী। দলীয় সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসম্পর্ক, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাঙালি ও বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্ক স্পষ্ট ধারণা আছে তার। সম্ভবত সেই কারণেই বাংলাদেশে একজন রাজনৈতিক নেতাকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল নর্থব্লক।
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক গত এক দশকের বেশি সময় স্থিতিশীল থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে কিছু কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। তারেক রহমানের আমলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ঢাকার সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক সাজানোর উদ্যোগ নিচ্ছে দিল্লি। উভয় দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে ধারণা থাকলেই এই উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই নিয়োগকে দেখা হচ্ছে ‘রিসেট’ বা নতুনভাবে সম্পর্ক সাজানোর উদ্যোগ হিসেবে।

ভারতের কূটনৈতিক প্রথায় সাধারণত অভিজ্ঞ আইএফএস (ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস) আধিকারিকদেরই এমন গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে নিয়োগ করা হয়। সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে পাঠানো মানে; দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে রাজনৈতিক বার্তা জোরালো করা। দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও রাজনৈতিক বোঝাপড়া বাড়ানো। এবং সীমান্ত, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সরাসরি সমন্বয় সাধন করা।
এছাড়াও সাবেক কূটনীতিকদের একটা অংশ মনে করেন, বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়ার পর দুই দেশের আস্থার সম্পর্কে কোথাও একটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তা শুধু কূটনীতি দিয়ে শুধরোনো সম্ভব নয়। সেজন্য দরকার রাজনৈতিক বিচক্ষণতাও। দীনেশ ত্রিবেদীকে রাষ্ট্রদূত পদে নিয়োগ করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত স্পষ্ট করে দিল যে আঞ্চলিক সুরক্ষা, দ্বিপাক্ষিক আস্থা ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে ভারত সরকার অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালীদের নিয়োগ করছে। এর আগেও একই কারণে প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল দলবীর সিং সুহাগকে সেশেলসে পাঠানো হয়েছিল।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য রাজনীতির অন্যতম পরিচিত মুখ দীনেশ ত্রিবেদী। নির্বাচনের মুখে পশ্চিমবঙ্গের এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রদূতের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে করে রাজনৈতিক বার্তাও কী দিলেন মোদি? এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
একটা সময়ে নয়াদিল্লিতে বা সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূত ছিলেন দীনেশ। কিন্তু ২০১৬ সালের পর থেকেই একটু একটু করে সম্পর্কের অবনতি ঘটতে শুরু করে। শেষমেষ একুশের বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন দীনেশ।
দীনেশের রাজনৈতিক যাত্রার শুরু অবশ্য সেই আশির দশকে। সেই সময় তিনি কংগ্রেসে ছিলেন। পরে যোগ দেন জনতা দলে। ১৯৯০ সালে রাজ্যসভার সাংসদ হন প্রথম বার। এর পর দীনেশ যোগ দেন তৃণমূলে। সেখানেও রাজ্যসভার সাংসদ পদ পান তিনি। প্রথমবার ভোটে লড়েন ২০০৯ সালে।
দ্বিতীয় ইউপিএ সরকারের সেই জমানায় তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হিসাবে তিনি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রী ছিলেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। যদিও ২০১৯ সালে ওই বারাকপুরেই তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে হেরে যান তিনি।
এরপর তৃণমূল তাকে রাজ্যসভায় পাঠায়। ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস থেকে ইস্তফা দেন দীনেশ ত্রিবেদী। ওই বছরের ৬ মার্চে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। এবার কেন্দ্রীয় সরকার তাকেই বড় দায়িত্ব দিল।
প্রতিনিধির নাম 













