ভারতের সংগীতজগতে প্রায় দুই দশক ধরে উজ্জ্বল এক নাম শ্রেয়া ঘোষাল। অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়ে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি সংগীত অঙ্গন নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে বলিউডের জনপ্রিয় গানগুলোর তালিকায় নারী শিল্পীদের কণ্ঠে গাওয়া গানের সংখ্যা তুলনামূলক কম কেন– এই বিষয়টি নিয়ে নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তিনি।
সম্প্রতি একটি আলাপচারিতামূলক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভারতীয় সংগীত অঙ্গনে নারীদের অবস্থান নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন শ্রেয়া ঘোষাল। তিনি মনে করেন, সংগীতজগতের এই বৈষম্য আসলে সমাজের বাস্তবতারই প্রতিফলন।
ভারতের সামাজিক কাঠামোর কথা উল্লেখ করে শ্রেয়া ঘোষাল বলেন, “এই বৈষম্য কেবল সংগীতের ক্ষেত্রেই নয়, বরং আমাদের সমাজের প্রতিফলন। সত্যি বলতে ভারতীয় সমাজ এখনও অনেকটাই পুরুষতান্ত্রিক।”
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা সরাসরি পরিবেশনার তালিকা নয়, বরং জনপ্রিয়তার তালিকাগুলো দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
শ্রেয়া ঘোষালের ভাষায়, “জনপ্রিয়তার তালিকায় থাকা সেরা গানগুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। বলুন তো, কতগুলো গান নারী শিল্পীরা গেয়েছেন? খুবই কম। সেরা ৫০টি গানের তালিকায় গেলে দেখা যায়, হয়তো মাত্র ছয় বা সাতটি গান গায়িকাদের কণ্ঠে। এই বৈষম্য সত্যিই চোখে পড়ার মতো।”
শ্রেয়া ঘোষাল মনে করেন, অতীতে ভারতীয় সংগীত অঙ্গনে নারী শিল্পীদের প্রভাব অনেক বেশি ছিল। উদাহরণ হিসেবে তিনি কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, “লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের সময়টা দেখুন। তারা পুরো একটি যুগকে প্রভাবিত করেছিলেন। অনেক ক্ষেত্রেই তারা পুরুষ শিল্পীদের চেয়েও বেশি জনপ্রিয় ছিলেন এবং বছরে অসংখ্য গান গাইতেন। কিন্তু এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আমার মনে হয়, গত প্রায় দশ বছর ধরে এই পরিস্থিতি চলছে।”
একই আলাপচারিতায় শ্রেয়া ঘোষাল আরও জানান, তিনি আগে ‘চিকনি চামেলি’ ধরনের গানেও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। তবে এখন থেকে এ ধরনের গানে কণ্ঠ দেওয়া থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখতে চান তিনি। তাঁর মতে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের ধরন ও শিল্পীদের অবস্থানও বদলাচ্ছে।
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। শ্রেয়া ঘোষালের বিশ্বাস, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বিভ্রান্তি কেটে যাবে এবং সংগীত অঙ্গনে নারী শিল্পীদের উপস্থিতি আবারও শক্তভাবে ফিরে আসবে। বর্তমানে তিনি তার ‘অল হার্টস’ বিশ্ব সফর নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এই সফরের অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে সংগীত পরিবেশন করবেন তিনি। তাঁর মতে, সংমিশ্রণধর্মী সংগীত ও নতুন ধরনের সংগীতচর্চার মাধ্যমে গায়িকারা আবারও তাদের হারানো মর্যাদা ফিরে পাবেন।
শ্রেয়া ঘোষালের সংগীতজীবনের শুরুটাও ছিল অনুপ্রেরণামূলক। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী মাত্র চার বছর বয়স থেকেই মায়ের কাছে গানের তালিম নিতে শুরু করেন। পরে প্রথাগত হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সংগীতেও প্রশিক্ষণ নেন। ২০০০ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি জি টিভির সংগীত প্রতিযোগিতা ‘সা রে গা মা পা’-তে অংশ নিয়ে বিজয়ী হন। সেখানেই পরিচালক সঞ্জয় লীলা বনশালির নজরে পড়েন তিনি।
পরবর্তীকালে বনশালির চলচ্চিত্র ‘দেবদাস’-এ ঐশ্বর্য রাইয়ের চরিত্রের জন্য কণ্ঠ দেওয়ার সুযোগ পান শ্রেয়া ঘোষাল। ‘ডোলারে ডোলা’ ও ‘বৈরী পিয়া’ গানের মাধ্যমে প্রথম ছবিতেই ব্যাপক সাড়া ফেলেন তিনি এবং অর্জন করেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। প্রায় আড়াই দশক ধরে তাঁর কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ সংগীতপ্রেমীরা। লতা-পরবর্তী প্রজন্মে গোটা দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নারী কণ্ঠশিল্পীদের তালিকায় শীর্ষ সারিতেই রয়েছে এই বাঙালি গায়িকার নাম।
প্রতিনিধির নাম 
















