ঢাকা ০৯:৪৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ২০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নাসিক নির্বাচনে আলোচনার তুঙ্গে আড়াইহাজারের তরুণ সমাজসেবক রাকিবুল আলম রাকিব শিগগিরই সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের ঘোষণা, জানাল ইরানি গণমাধ্যম খামেনিকে হত্যার ঘটনায় বিক্ষোভে সরব জামায়াত-সিপিবি মার্চের শুরুতেই কালবৈশাখীর দাপট, মাসের শেষে তাপপ্রবাহের আশঙ্কা নারিন্দায় এসির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, দগ্ধ তিনজন অভিনেতা আলভীর স্ত্রীর রহস্যজনক মরদেহ উদ্ধার খামেনির অবস্থান চিহ্নিত করে সিআইএ, লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের হামলা নারায়ণগঞ্জে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় শিশু ও নার্স নিহত হামলা নিয়ে ট্রাম্পের নিশ্চিত বার্তা, সুরক্ষিত স্থানে খামেনি স্বামী-স্ত্রী রূপে প্রথমবার জনসমক্ষে বিজয়-রাশমিকা

মানুষের হৃদয়ে চিরকাল দেশনেত্রী হয়েই থাকবেন তিনি

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৩:১৪:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬
  • ১৩৬ বার পড়া হয়েছে

মানুষের হৃদয়ে চিরকাল দেশনেত্রী হয়েই থাকবেন তিনি

দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই’- তার এই একটি বাক্য আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। আজ সেই প্রিয় স্বদেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতির কোলাহল, বিতর্ক, অভিযোগ আর প্রতিপক্ষের কঠোর ভাষার ভিড়েও এই কথাটি যেন এক অনাড়ম্বর দেশপ্রেমের ঘোষণা। এখানে কোনো শ্লোগান নেই, নেই কৃত্রিম আবেগ; আছে কেবল নিজের মাটির সঙ্গে আত্মার সম্পর্কের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়াকে বহু সংকট, নিপীড়ন ও অবমাননার মুখোমুখি হতে হয়েছেন।

ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যেমন বিতর্ক ছিল, ক্ষমতার বাইরে থাকাকালেও তেমনি ছিল কঠিন সময়। তবুও এই দেশের মাটি, মানুষ ও ভবিষ্যতের দায় থেকে তিনি নিজেকে আলাদা করেননি। রাজনীতি যেখানে অনেকের কাছে সুবিধা আর নিরাপদ আশ্রয়ের সিঁড়ি হয়ে ওঠে, সেখানে এই বক্তব্য এক ধরনের নৈতিক অবস্থান। খালেদা জিয়ার এই উক্তি তাই কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দায়বদ্ধতা, শেকড় ও আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতীক।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর, বেদনাবিধুর দিন ৩০ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার। এদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অগ্নিশিখা বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই মৃত্যু শুধু দলীয় নেতা-কর্মীই নয়, সমগ্র দেশবাসী শোকার্ত। এই শোক একজন রাজনৈতিক অভিভাবক হারানোর।

দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান চরিত্র। একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নেমে দশ বছরের মধ্যেই বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়েছিলেন। বারবার মুখোমুখি হয়েছেন নানা চড়াই, উতরাই ও ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির। কিন্তু কোন সংকটই তাকে তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।

সেই দৃষ্টিকোন থেকে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী নন, তিনি ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। সেনাশাসনের অন্ধকার ভেদ করে তিনি রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন দৃপ্তকণ্ঠে, আপসহীন মননে। তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর ভেঙে পড়ার বদলে তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন দলের- যা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে দৃষ্টান্ত। আমরা দেখেছি তার রাজনীতি ছিল আবেগময়, কিন্তু সিদ্ধান্তে কঠোর। রাজপথের আন্দোলন, সংসদের তীব্র বিরোধিতা, কারাগারের নীরব প্রাচীর- সবকিছুই তার জীবনের দৃশ্যমান অধ্যায়। বারবার বন্দি হয়েছেন, অসুস্থ হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন- তবু মাথা নত করেননি।

আমি রাজনীতির মানুষ নই। আমার পরিচয় এই অভিধায় যুক্ত হোক সেই ইচ্ছা বা আগ্রহও আমার নেই। তবে দেশের একজন রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক আমি। তাই একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে প্রজন্মের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আজকে আমার এই মূল্যায়ন। যে কারণে বেগম খালেদা জিয়া আমার কাছে একজন মাতৃসম, একজন আপোষহীন নেত্রী এবং গণতন্ত্রের এক অনন্য ইতিহাস।

ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়া বিধবা হন ৩৬ বছর বয়সে। তখন ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান-দুই সন্তান নিয়েই ছিল তার সংসার। তার পুরো নাম ছিল খালেদা খানম। পরিবারিক নাম ছিল পুতুল। জিয়াউর রহমান ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন, তখন তাদের বিয়ে হয়। তিনি বিয়ের পরই তার স্বামীর নামের সাথে মিলিয়ে হন খালেদা জিয়া। তবে রাজনীতির মাঠে তিনি খালেদা জিয়া।

জানা যায়, খালেদা জিয়ার জন্ম ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে। তার বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার এবং মায়ের নাম তৈয়বা মজুমদার। তাদের আদি ভিটা ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। তবে তার পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করতো দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া এলাকায়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে খালেদা জিয়া হলেন তৃতীয়। তার বড় দুই বোন এবং ছোট দুভাই।

NEW21
NEW21

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা পূর্বপরিকল্পিত কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর হঠাৎ করেই এক শূন্যতা ও সংকটের মুখে পড়েন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর বেদনা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল বাস্তবতার মাঝেই তাকে দায়িত্ব নিতে হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির। সেই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩ জানুয়ারি। প্রথমে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। এর পরের বছর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে দলটির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সে সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, রাজনীতিতে তিনি হয়তো অল্পদিনের অতিথি। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করেছে- ক্ষণস্থায়ী নন বরং তিনি এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অধ্যায়ে অবস্থানকারী শক্তি।

আমার বিশ্লেষণ, ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্বামীহারা এক নারীর শোক তখনো কাটেনি, তার আগেই তাকে সামনে দাঁড়াতে হয় একটি ভাঙাচোরা দল, একটি বিভক্ত জাতি এবং ষড়যন্ত্রে ভরা রাজনীতির মুখোমুখি। কারণ তার রাজনীতিতে আসা ছিল না ক্ষমতার স্বপ্ন নিয়ে, ছিল না রাজনীতির উত্তরাধিকার হিসেবে তৈরি করা কোন পথেও। সেই সময় তিনি চাইলে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারতেন, নিভৃতে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি করেননি। তিনি জনগণের কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন, মাথা উঁচু করে, চোখে অশ্রু নিয়েই।

স্বামীর মৃত্যুর শোককে তিনি নিজের শক্তি বানিয়েছেন। সেই শক্তি থেকেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপিকে। সংগঠিত করেছেন দলটি। রাজপথে নেমেছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। সে সময় অনেকে ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়া হয়তো প্রতীকী নেত্রী । পর্দার আড়ালে অন্যরা চালাবে রাজনীতি। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, খালেদা জিয়া ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তের মালিক, নিজের পথের পথিক।

আমার সেই তারুণ্যছোঁয়া সময়ে দেখেছি, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশ ছিল গণতন্ত্রহীনতার দীর্ঘ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনরায় চালু করা ছিল একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। সেই সময় তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মোড়ে প্রবেশ করে। আমার দৃষ্টিতে- সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন- তার শাসনামলের অন্যতম বড় অর্জন। এটি শুধু একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন ছিল না- এটি ছিল জনগণের ভোটের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার এক সাহসী পদক্ষেপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্র ছাড়া রাষ্ট্র টেকে না। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বারবার বলেছিলেন- নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ, জনগণের মতামত প্রতিফলিত হতে হবে অবাধভাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে তার অনড় অবস্থান ছিল তার আপসহীনতার বড় উদাহরণ। ক্ষমতার জন্য নয়, বরং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য তিনি আপোষ করেননি।

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া তিন দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তার শাসনামলে উন্নয়ন হয়েছে, আবার সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে ক্ষমতার বাইরে- রাজপথে, আন্দোলনে, বিরোধিতায়। তিনি জানতেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু অবস্থান স্থায়ী হতে পারে। ক্ষমতায় না থেকেও তিনি ছিলেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। রাজপথে আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ- এসবের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। অনেক সময় এই আন্দোলনের কারণে তাকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন- অন্যায়ের সঙ্গে আপস করার চেয়ে সংগ্রাম শ্রেয়।

এ কথা সত্য যে, খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় শুরু হয় তার কারাবাসের মধ্য দিয়ে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত এক নেত্রীকে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকতে হয়েছে। রাজনীতির নিষ্ঠুরতা এখানে মানবিকতাকে হার মানিয়েছে। চিকিৎসার প্রশ্নে টানাপোড়েন, মুক্তির আবেদন- সব মিলিয়ে এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, গভীর মানবিক সংকট। তবে কারাগারও তাকে ভাঙতে পারেনি। তিনি নীরবে সহ্য করেছেন, মাথা নিচু করেননি। কারাগারে থেকেও তিনি ছিলেন তার দলের প্রেরণার উৎস, প্রতিরোধের প্রতীক। খালেদা জিয়ার জীবনের আরেকটি করুণ দিক হলো- নিঃসঙ্গতা। স্বামীহারা, এক সন্তানকে হারানোর বেদনা, আরেক সন্তান প্রবাসে- এই ব্যক্তিগত শূন্যতার মাঝেই তাকে বহন করতে হয়েছে রাষ্ট্র ও দলের ভার।

তার জীবন আমাদের শেখায়- ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু অবস্থান ইতিহাসে থেকে যায়। শেখায়- নারী নেতৃত্ব শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, সাহস ও সংগ্রামের নাম। শেখায়- একজন মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে নুয়ে না গিয়ে কীভাবে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। এ কথা সত্য, পরপারে চলে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া- কিন্তু তার রেখে যাওয়া দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা- সর্বোপরি তার আদর্শ নিভে যায়নি। তা ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কর্মীর হৃদয়ে, রাজনীতির স্মৃতিতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে। এতে প্রকাশ পায় নিজের দেশকে কেন্দ্র করে বাঁচার দৃঢ় অঙ্গীকার। সংকট, ভয় কিংবা প্রলোভন সত্ত্বেও দেশের মাটিতে তিনি আঁকড়ে থেকেছেন। আজ চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন স্বামীর করবের পাশে, তার প্রিয় দেশের মাটিতে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- দেশই শেষ আশ্রয়, দেশই পরিচয়, দেশই তার শেষ ঠিকানা। আর তাই তিনি বেঁচে থাকবেন দেশের সকল মানুষের হৃদয়ে দেশনেত্রী হয়ে। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। পরম করুণাময় যেন তাকে বেহস্ত নসিব করেন।

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

নাসিক নির্বাচনে আলোচনার তুঙ্গে আড়াইহাজারের তরুণ সমাজসেবক রাকিবুল আলম রাকিব

মানুষের হৃদয়ে চিরকাল দেশনেত্রী হয়েই থাকবেন তিনি

আপডেট সময় : ০৩:১৪:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারী ২০২৬

দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নাই’- তার এই একটি বাক্য আমার মনে গভীরভাবে দাগ কেটে আছে। আজ সেই প্রিয় স্বদেশের মাটিতেই চিরনিদ্রায় শায়িত বেগম খালেদা জিয়া। রাজনীতির কোলাহল, বিতর্ক, অভিযোগ আর প্রতিপক্ষের কঠোর ভাষার ভিড়েও এই কথাটি যেন এক অনাড়ম্বর দেশপ্রেমের ঘোষণা। এখানে কোনো শ্লোগান নেই, নেই কৃত্রিম আবেগ; আছে কেবল নিজের মাটির সঙ্গে আত্মার সম্পর্কের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়াকে বহু সংকট, নিপীড়ন ও অবমাননার মুখোমুখি হতে হয়েছেন।

ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় যেমন বিতর্ক ছিল, ক্ষমতার বাইরে থাকাকালেও তেমনি ছিল কঠিন সময়। তবুও এই দেশের মাটি, মানুষ ও ভবিষ্যতের দায় থেকে তিনি নিজেকে আলাদা করেননি। রাজনীতি যেখানে অনেকের কাছে সুবিধা আর নিরাপদ আশ্রয়ের সিঁড়ি হয়ে ওঠে, সেখানে এই বক্তব্য এক ধরনের নৈতিক অবস্থান। খালেদা জিয়ার এই উক্তি তাই কেবল ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে দায়বদ্ধতা, শেকড় ও আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতীক।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর, বেদনাবিধুর দিন ৩০ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার। এদিন পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অগ্নিশিখা বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এই মৃত্যু শুধু দলীয় নেতা-কর্মীই নয়, সমগ্র দেশবাসী শোকার্ত। এই শোক একজন রাজনৈতিক অভিভাবক হারানোর।

দীর্ঘ চুয়াল্লিশ বছর ধরে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান চরিত্র। একজন গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে নেমে দশ বছরের মধ্যেই বিএনপিকে ক্ষমতায় নিয়েছিলেন। বারবার মুখোমুখি হয়েছেন নানা চড়াই, উতরাই ও ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির। কিন্তু কোন সংকটই তাকে তার নীতিগত অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।

সেই দৃষ্টিকোন থেকে বেগম খালেদা জিয়া কেবল একটি দলের নেত্রী নন, তিনি ছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক। সেনাশাসনের অন্ধকার ভেদ করে তিনি রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন দৃপ্তকণ্ঠে, আপসহীন মননে। তার স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যার পর ভেঙে পড়ার বদলে তিনি শক্ত হাতে হাল ধরেছিলেন দলের- যা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে দৃষ্টান্ত। আমরা দেখেছি তার রাজনীতি ছিল আবেগময়, কিন্তু সিদ্ধান্তে কঠোর। রাজপথের আন্দোলন, সংসদের তীব্র বিরোধিতা, কারাগারের নীরব প্রাচীর- সবকিছুই তার জীবনের দৃশ্যমান অধ্যায়। বারবার বন্দি হয়েছেন, অসুস্থ হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন- তবু মাথা নত করেননি।

আমি রাজনীতির মানুষ নই। আমার পরিচয় এই অভিধায় যুক্ত হোক সেই ইচ্ছা বা আগ্রহও আমার নেই। তবে দেশের একজন রাজনৈতিক সচেতন নাগরিক আমি। তাই একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে প্রজন্মের একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আজকে আমার এই মূল্যায়ন। যে কারণে বেগম খালেদা জিয়া আমার কাছে একজন মাতৃসম, একজন আপোষহীন নেত্রী এবং গণতন্ত্রের এক অনন্য ইতিহাস।

ইতিহাসের পাঠ থেকে জানা যায়, খালেদা জিয়া বিধবা হন ৩৬ বছর বয়সে। তখন ছিলেন একজন সাধারণ গৃহবধূ। তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান-দুই সন্তান নিয়েই ছিল তার সংসার। তার পুরো নাম ছিল খালেদা খানম। পরিবারিক নাম ছিল পুতুল। জিয়াউর রহমান ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে যখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে একজন ক্যাপ্টেন ছিলেন, তখন তাদের বিয়ে হয়। তিনি বিয়ের পরই তার স্বামীর নামের সাথে মিলিয়ে হন খালেদা জিয়া। তবে রাজনীতির মাঠে তিনি খালেদা জিয়া।

জানা যায়, খালেদা জিয়ার জন্ম ব্রিটিশ ভারতের জলপাইগুড়িতে। তার বাবার নাম ইস্কান্দর মজুমদার এবং মায়ের নাম তৈয়বা মজুমদার। তাদের আদি ভিটা ছিল ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলায়। তবে তার পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করতো দিনাজপুর শহরের মুদিপাড়া এলাকায়। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে খালেদা জিয়া হলেন তৃতীয়। তার বড় দুই বোন এবং ছোট দুভাই।

NEW21
NEW21

খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা পূর্বপরিকল্পিত কোন উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফল নয়। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর হঠাৎ করেই এক শূন্যতা ও সংকটের মুখে পড়েন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনের গভীর বেদনা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রতিকূল বাস্তবতার মাঝেই তাকে দায়িত্ব নিতে হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপির। সেই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া বিএনপিতে যোগ দেন ১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে ৩ জানুয়ারি। প্রথমে তিনি দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। এর পরের বছর ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মে দলটির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সে সময় অনেকেই ভেবেছিলেন, রাজনীতিতে তিনি হয়তো অল্পদিনের অতিথি। কিন্তু সময়ই প্রমাণ করেছে- ক্ষণস্থায়ী নন বরং তিনি এক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অধ্যায়ে অবস্থানকারী শক্তি।

আমার বিশ্লেষণ, ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে জিয়াউর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ড তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। স্বামীহারা এক নারীর শোক তখনো কাটেনি, তার আগেই তাকে সামনে দাঁড়াতে হয় একটি ভাঙাচোরা দল, একটি বিভক্ত জাতি এবং ষড়যন্ত্রে ভরা রাজনীতির মুখোমুখি। কারণ তার রাজনীতিতে আসা ছিল না ক্ষমতার স্বপ্ন নিয়ে, ছিল না রাজনীতির উত্তরাধিকার হিসেবে তৈরি করা কোন পথেও। সেই সময় তিনি চাইলে নিজেকে গুটিয়ে নিতে পারতেন, নিভৃতে চলে যেতে পারতেন, কিন্তু তা তিনি করেননি। তিনি জনগণের কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন, মাথা উঁচু করে, চোখে অশ্রু নিয়েই।

স্বামীর মৃত্যুর শোককে তিনি নিজের শক্তি বানিয়েছেন। সেই শক্তি থেকেই তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বিএনপিকে। সংগঠিত করেছেন দলটি। রাজপথে নেমেছেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে। সে সময় অনেকে ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়া হয়তো প্রতীকী নেত্রী । পর্দার আড়ালে অন্যরা চালাবে রাজনীতি। কিন্তু সময় প্রমাণ করেছে, খালেদা জিয়া ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তের মালিক, নিজের পথের পথিক।

আমার সেই তারুণ্যছোঁয়া সময়ে দেখেছি, ১৯৯০-এর স্বৈরাচার পতনের পর ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে খালেদা জিয়া যখন প্রধানমন্ত্রী হন, তখন দেশ ছিল গণতন্ত্রহীনতার দীর্ঘ অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথে। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে পুনরায় চালু করা ছিল একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব। সেই সময় তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক মোড়ে প্রবেশ করে। আমার দৃষ্টিতে- সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন- তার শাসনামলের অন্যতম বড় অর্জন। এটি শুধু একটি সাংবিধানিক পরিবর্তন ছিল না- এটি ছিল জনগণের ভোটের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার এক সাহসী পদক্ষেপ। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্র ছাড়া রাষ্ট্র টেকে না। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বারবার বলেছিলেন- নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ, জনগণের মতামত প্রতিফলিত হতে হবে অবাধভাবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে তার অনড় অবস্থান ছিল তার আপসহীনতার বড় উদাহরণ। ক্ষমতার জন্য নয়, বরং নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য তিনি আপোষ করেননি।

উল্লেখ্য, খালেদা জিয়া তিন দফা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। তার শাসনামলে উন্নয়ন হয়েছে, আবার সমালোচনাও হয়েছে। কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ কেটেছে ক্ষমতার বাইরে- রাজপথে, আন্দোলনে, বিরোধিতায়। তিনি জানতেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু অবস্থান স্থায়ী হতে পারে। ক্ষমতায় না থেকেও তিনি ছিলেন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। রাজপথে আন্দোলন, হরতাল, অবরোধ- এসবের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। অনেক সময় এই আন্দোলনের কারণে তাকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে, কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন- অন্যায়ের সঙ্গে আপস করার চেয়ে সংগ্রাম শ্রেয়।

এ কথা সত্য যে, খালেদা জিয়ার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় শুরু হয় তার কারাবাসের মধ্য দিয়ে। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, নানা শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত এক নেত্রীকে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি থাকতে হয়েছে। রাজনীতির নিষ্ঠুরতা এখানে মানবিকতাকে হার মানিয়েছে। চিকিৎসার প্রশ্নে টানাপোড়েন, মুক্তির আবেদন- সব মিলিয়ে এটি শুধু রাজনৈতিক নয়, গভীর মানবিক সংকট। তবে কারাগারও তাকে ভাঙতে পারেনি। তিনি নীরবে সহ্য করেছেন, মাথা নিচু করেননি। কারাগারে থেকেও তিনি ছিলেন তার দলের প্রেরণার উৎস, প্রতিরোধের প্রতীক। খালেদা জিয়ার জীবনের আরেকটি করুণ দিক হলো- নিঃসঙ্গতা। স্বামীহারা, এক সন্তানকে হারানোর বেদনা, আরেক সন্তান প্রবাসে- এই ব্যক্তিগত শূন্যতার মাঝেই তাকে বহন করতে হয়েছে রাষ্ট্র ও দলের ভার।

তার জীবন আমাদের শেখায়- ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু অবস্থান ইতিহাসে থেকে যায়। শেখায়- নারী নেতৃত্ব শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, সাহস ও সংগ্রামের নাম। শেখায়- একজন মানুষ রাষ্ট্রযন্ত্রের চাপে নুয়ে না গিয়ে কীভাবে প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন। এ কথা সত্য, পরপারে চলে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া- কিন্তু তার রেখে যাওয়া দেশপ্রেম, মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও ভালোবাসা- সর্বোপরি তার আদর্শ নিভে যায়নি। তা ছড়িয়ে আছে অসংখ্য কর্মীর হৃদয়ে, রাজনীতির স্মৃতিতে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে। এতে প্রকাশ পায় নিজের দেশকে কেন্দ্র করে বাঁচার দৃঢ় অঙ্গীকার। সংকট, ভয় কিংবা প্রলোভন সত্ত্বেও দেশের মাটিতে তিনি আঁকড়ে থেকেছেন। আজ চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন স্বামীর করবের পাশে, তার প্রিয় দেশের মাটিতে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়- দেশই শেষ আশ্রয়, দেশই পরিচয়, দেশই তার শেষ ঠিকানা। আর তাই তিনি বেঁচে থাকবেন দেশের সকল মানুষের হৃদয়ে দেশনেত্রী হয়ে। আমি তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। পরম করুণাময় যেন তাকে বেহস্ত নসিব করেন।