ঢাকা ০৪:৪৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ৪ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ভোলায় তিন দশকে জামায়াতের ভোটে ২২ গুণ উত্থান

  • NEWS 21 STAFF RAFI
  • আপডেট সময় : ০৫:০৮:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • ১৩ বার পড়া হয়েছে

ভোলায় তিন দশকে জামায়াতের ভোটে ২২ গুণ উত্থান

১৯৯১ সালের পর থেকে দ্বীপজেলা ভোলার চারটি সংসদীয় আসনেই ভোটের লড়াই ছিল মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক। ভোটের রাজনীতি ও জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ সবই ছিল এই দুই দলকে ঘিরে। কিন্তু আওয়ামী লীগবিহীন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সাড়ে তিন দশকের সেই হিসাব পাল্টে গেছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক শক্তি বা ভোটের মাঠে তারা (জামায়াতে ইসলামী) এখন নতুন শক্তি, যা ভোটের হিসাবেও উঠে এসেছে। মাঠ ও কেন্দ্রে বিএনপিকে জামায়াতের শক্ত প্রাচীরের সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাজনৈতিক সচেতন মহল এটিকে ভোলায় জামায়াতের ‘নব উত্থান’ হিসেবে দেখছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার চারটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬৮৮ জন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫৩টি। এর মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩২ হাজার ৮৪৩। মোট কাস্টিং ভোটের হার ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৬৯ ভোট পেয়ে বিএনপির চারজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, যা কাস্টিং ভোটের ৬০ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর চার প্রার্থী পেয়েছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮২৮ ভোট। জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের হার ৩৩ শতাংশ। এর আগের কোনো নির্বাচনেই ভোলায় জামায়াতে ইসলামীর ভোটের সংখ্যা এতো বেশি ছিল না। এবারের নির্বাচনে মোট ২৯ জন বৈধ প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে। এর বাইরে যে ২১ জন প্রার্থী ছিলেন, তারা সবাই জামানত হারিয়েছেন। ১৯৯১ সালের ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ভোটের মাঠে চমক দেখিয়েছে ভোলার জামায়াতে ইসলামী।

ভোলা-১ (সদর)

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এ এফ এম আবদুল হামিদ। তিনি পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৩৮২ ভোট, যা ছিল কাস্টিং ভোটের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ৯৮ হাজার ৩টি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী হয়ে আবু বকর সিদ্দিক পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৭১ ভোট, যা মোট ভোটের ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ওই নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। পরবর্তীতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে জামায়াতে ইসলামী। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৩৩৭ ভোট। যা মোট কাস্টিং ভোটের ৩৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৫ শতাংশ থেকে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে জামায়াতের ভোট। গত ৩০ বছরে দলটির ভোট বেড়েছে প্রায় ২ হাজার শতাংশেরও বেশি। এবার এই আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ২ লাখ ১৩ হাজার ১৮১ জন। অন্যদিকে, ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) ভোলা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোশারেফ হোসেন শাজাহান ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে পেয়েছিলেন ২৪ হাজার ৯২২ ভোট, যা ছিল কাস্টিং ভোটের ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির ভোট বেড়ে হয় ৪৭ হাজার ৭৫৯। আর ২০২৬ সালে বিএনপি জোটের প্রার্থী বিজেপি চেয়ারম্যান পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট। যা ১৯৯১ সালের চেয়ে প্রায় ১৬৩ শতাংশ বেশি।

ভোলা-২ (দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন)

১৯৯১ সালে এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচন করেছিলেন কামালুদ্দিন জাফরী। তিনি পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৫৪৬ ভোট, যা ছিল প্রদত্ত ভোটের ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৯ হাজার ৮০০। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে মোহাম্মদ ফজলুল করিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৪ হাজার ৫৬২ ভোট পান। সেই একই প্রার্থী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৭০৩ ভোট। যা মোট কাস্টিং ভোটের ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তিন দশকে এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে বহুগুণ। ৪ শতাংশ থেকে ভোট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ শতাংশে। এ বছর ভোলা-২ আসনে মোট কাস্টিং ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৪২২। অপরদিকে, ১৯৯১ সালে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদুল হক চৌধুরী পেয়েছিলেন ৮ হাজার ৬৭০ ভোট (১০ দশমিক ৯ শতাংশ)। ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে পান ৪০ হাজার ৬৪৩ ভোট (৪২ দশমিক ১৩ শতাংশ)। ২০২৬ সালের নির্বাচনে হাফিজ ইব্রাহিম ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ ভোট পেয়েছেন, যা কাস্টিং ভোটের প্রায় ৫৫ শতাংশ। ৩০ বছরে এ আসনে বিএনপির ভোট বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৬১ শতাংশ।

 ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন)

১৯৯১ সালে ভোলা-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী ছিলেন না। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক পেয়েছিলেন ১ হাজার ৯৬১ ভোট (২ দশমিক ৪ শতাংশ)। মোট ভোট পড়েছিল ৮২ হাজার ২১৬টি। সেবার বিপুল ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির বর্তমান জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোট পড়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা শেহাবুদ্দিন পেয়েছিলেন ২ হাজার ৭৪৩ ভোট (২ দশমিক ২৮ শতাংশ)। আর ত্রয়োদশ নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থী নিজামুল হক পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৩৫১ ভোট। প্রাপ্ত ভোটের ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ পড়েছে জামায়াতের বাক্সে। অর্থাৎ ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭ শতাংশ হয়েছে জামায়াতের ভোট। ১৯৯৬ থেকে ২০২৬ তিন দশকের ব্যবধানে এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে প্রায় ২ হাজার শতাংশ।এদিকে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯০ ভোট। যা প্রদত্ত ভোটের ৬৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৯৬ পরবর্তী সময়ে এ আসনে বিএনপির ভোট বেড়েছে বহুগুণ।

NEWS21
NEWS21

ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা)

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসনে ভোট পড়েছিল ৭১ হাজার ৮৭৭টি। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান পেয়েছিলেন ৭ হাজার ৯৭ ভোট (প্রায় ১০ শতাংশ)। ৯৬ সালের নির্বাচনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে প্রফেসর জিয়াউল মোর্শেদ পান ৩ হাজার ২৪২ ভোট (২ দশমিক ৮০ শতাংশ)। এবারের নির্বাচনে এ আসনে ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী মোস্তফা কামাল পেয়েছেন ৮১ হাজার ৪৩৭ ভোট। যা প্রদত্ত ভোটের ২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তিন দশকের ব্যবধানে এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে ১ হাজার ১৪৬ শতাংশ। অপরদিকে, ১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল একরাম ভোট পেয়েছিলেন ৯ হাজার ১১০ (১২ দশমিক ৭ শতাংশ)। ১৯৯৬ সালে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আলম ভোট পান প্রায় ৬৪ হাজার (৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ)। ২০২৬ সালে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী নূরুল ইসলাম নয়ন পেয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫১ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৬৩ শতাংশ। ৯১ পরবর্তী সময়ে এ দলের ভোট বেড়েছে প্রায় ২ হাজার শতাংশ।

 ভোটার ও নেতাদের বক্তব্য

নির্বাচন নিয়ে কাজ করা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর ভোলা জেলা সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরীর মতে, বিগত নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোলায় ‘দাঁড়িপাল্লা’র ভোট বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের অনিয়ম, স্বৈরাচারী আচরণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশব্যাপী যে চাঁদাবাজি হয়েছে, সে কারণে কিছু মানুষ বিকল্প হিসেবে দাঁড়িপাল্লাকে বেছে নিয়েছে। যে কারণে তাদের ভোট বেড়েছে।’ ভোটের মাঠে জামায়াতের এই উত্থানের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়কেই দায়ী করেন তিনি। তবে আওয়ামী লীগকে বেশি দায়ী করেছেন মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী। জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মো. হারুন অর রশিদ বলছেন, তাদের ভোটের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। টার্গেটের চেয়ে কম ভোট পেয়েছে ‘দাঁড়িপাল্লা’। তিনি বলেন, ‘ভেতরের ইঞ্জিনিয়ারিং, বাইরে মব (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি; এসব কারণে আমরা আমাদের ভোট ধরে রাখতে পারিনি। যেমন প্রত্যেকটা কেন্দ্রের বাইরে থেকে ২-৩শ লোক মব সৃষ্টি করেছে। ভেতরে ৭-৮ জন করে এজেন্ট দিয়েছে। এরপর পর্যবেক্ষকের নামে প্রতিকেন্দ্রে লোক দিয়ে সেখানেও মব সৃষ্টি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের (বিএনপির) লোক প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হয়েছে। যে কারণে আমাদের এজেন্ট এক-দুইজন থাকলেও তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।’ কয়েকটি কেন্দ্রে টাকা দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের অর্জিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।’ জেলার চারটি আসনেই তাদের অবস্থান প্রথম পর্যায়ে ছিল উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমরা মব সৃষ্টি করতে পারিনি, ঠেকাতেও পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। ওদের মব সৃষ্টি এবং পাল্টা-পাল্টি ঠেকাতে পারলে আমাদের বিজয় ধরে রাখতে পারতাম।’ ভোট বাড়লেও এসব কারণে তারা সন্তুষ্ট নন। অন্যদিকে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মব সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) জেলা সেক্রেটারি মোতাছিন বিল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি বিরোধী অনেকে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। এখানে জামায়াত ছিল মূল প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই অনেকেই আবেগে জামায়াতের পক্ষ নিয়েছে। এছাড়া জামায়াতের সকল কর্মী-সমর্থক এক হয়ে মাঠে নামায় তারা ভোটে অনেকটা সুবিধা পেয়েছে।’ ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম জানান, বিএনপির ভোট কমেনি, বরং বিএনপির জনসমর্থন আগের তুলনায় বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘এত বছর বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। তাদের অনুপস্থিতিতে কিছু ভোট জামায়াতে ইসলামী টানতে পেরেছে। তবে এখনও ভোলায় জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী নয়।’

ট্যাগস :

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

জনপ্রিয় সংবাদ

ভোটকেন্দ্রে জন্ম নেওয়া নবজাতকের নামকরণ হলো খালেদা

ভোলায় তিন দশকে জামায়াতের ভোটে ২২ গুণ উত্থান

আপডেট সময় : ০৫:০৮:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

১৯৯১ সালের পর থেকে দ্বীপজেলা ভোলার চারটি সংসদীয় আসনেই ভোটের লড়াই ছিল মূলত বিএনপি ও আওয়ামী লীগকেন্দ্রিক। ভোটের রাজনীতি ও জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ সবই ছিল এই দুই দলকে ঘিরে। কিন্তু আওয়ামী লীগবিহীন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সাড়ে তিন দশকের সেই হিসাব পাল্টে গেছে। এবারের নির্বাচনে বিএনপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেদের শক্ত অবস্থানের জানান দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক শক্তি বা ভোটের মাঠে তারা (জামায়াতে ইসলামী) এখন নতুন শক্তি, যা ভোটের হিসাবেও উঠে এসেছে। মাঠ ও কেন্দ্রে বিএনপিকে জামায়াতের শক্ত প্রাচীরের সম্মুখীন হতে হয়েছে। রাজনৈতিক সচেতন মহল এটিকে ভোলায় জামায়াতের ‘নব উত্থান’ হিসেবে দেখছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার চারটি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৯২ হাজার ৬৮৮ জন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৫৩টি। এর মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল ৯ লাখ ৩২ হাজার ৮৪৩। মোট কাস্টিং ভোটের হার ৫৬ দশমিক ৫০ শতাংশ। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫ লাখ ৫৯ হাজার ৯৬৯ ভোট পেয়ে বিএনপির চারজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন, যা কাস্টিং ভোটের ৬০ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর চার প্রার্থী পেয়েছেন ৩ লাখ ৭ হাজার ৮২৮ ভোট। জামায়াতের প্রাপ্ত ভোটের হার ৩৩ শতাংশ। এর আগের কোনো নির্বাচনেই ভোলায় জামায়াতে ইসলামীর ভোটের সংখ্যা এতো বেশি ছিল না। এবারের নির্বাচনে মোট ২৯ জন বৈধ প্রার্থী থাকলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে। এর বাইরে যে ২১ জন প্রার্থী ছিলেন, তারা সবাই জামানত হারিয়েছেন। ১৯৯১ সালের ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এবার ভোটের মাঠে চমক দেখিয়েছে ভোলার জামায়াতে ইসলামী।

ভোলা-১ (সদর)

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন এ এফ এম আবদুল হামিদ। তিনি পেয়েছিলেন ৩ হাজার ৩৮২ ভোট, যা ছিল কাস্টিং ভোটের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ওই নির্বাচনে মোট ভোট পড়েছিল ৯৮ হাজার ৩টি। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী হয়ে আবু বকর সিদ্দিক পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৭১ ভোট, যা মোট ভোটের ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ওই নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩। পরবর্তীতে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করেছে জামায়াতে ইসলামী। সর্বশেষ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৩৩৭ ভোট। যা মোট কাস্টিং ভোটের ৩৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। অর্থাৎ ৫ শতাংশ থেকে ৩৬ শতাংশে উন্নীত হয়েছে জামায়াতের ভোট। গত ৩০ বছরে দলটির ভোট বেড়েছে প্রায় ২ হাজার শতাংশেরও বেশি। এবার এই আসনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ২ লাখ ১৩ হাজার ১৮১ জন। অন্যদিকে, ৬ষ্ঠ সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) ভোলা-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মোশারেফ হোসেন শাজাহান ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে পেয়েছিলেন ২৪ হাজার ৯২২ ভোট, যা ছিল কাস্টিং ভোটের ২৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির ভোট বেড়ে হয় ৪৭ হাজার ৭৫৯। আর ২০২৬ সালে বিএনপি জোটের প্রার্থী বিজেপি চেয়ারম্যান পেয়েছেন ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট। যা ১৯৯১ সালের চেয়ে প্রায় ১৬৩ শতাংশ বেশি।

ভোলা-২ (দৌলতখান-বোরহানউদ্দিন)

১৯৯১ সালে এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচন করেছিলেন কামালুদ্দিন জাফরী। তিনি পেয়েছিলেন ৬ হাজার ৫৪৬ ভোট, যা ছিল প্রদত্ত ভোটের ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ওই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৮৯ হাজার ৮০০। ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে এ আসন থেকে মোহাম্মদ ফজলুল করিম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৪ হাজার ৫৬২ ভোট পান। সেই একই প্রার্থী ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৭০৩ ভোট। যা মোট কাস্টিং ভোটের ৪৩ দশমিক ৫ শতাংশ। তিন দশকে এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে বহুগুণ। ৪ শতাংশ থেকে ভোট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৩ শতাংশে। এ বছর ভোলা-২ আসনে মোট কাস্টিং ভোটের সংখ্যা ২ লাখ ১৫ হাজার ৪২২। অপরদিকে, ১৯৯১ সালে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শহীদুল হক চৌধুরী পেয়েছিলেন ৮ হাজার ৬৭০ ভোট (১০ দশমিক ৯ শতাংশ)। ১৯৯৬ সালে বিএনপির প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহিম ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে পান ৪০ হাজার ৬৪৩ ভোট (৪২ দশমিক ১৩ শতাংশ)। ২০২৬ সালের নির্বাচনে হাফিজ ইব্রাহিম ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৫ ভোট পেয়েছেন, যা কাস্টিং ভোটের প্রায় ৫৫ শতাংশ। ৩০ বছরে এ আসনে বিএনপির ভোট বেড়েছে ৪৭ দশমিক ৬১ শতাংশ।

 ভোলা-৩ (লালমোহন-তজুমদ্দিন)

১৯৯১ সালে ভোলা-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামীর কোনো প্রার্থী ছিলেন না। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক পেয়েছিলেন ১ হাজার ৯৬১ ভোট (২ দশমিক ৪ শতাংশ)। মোট ভোট পড়েছিল ৮২ হাজার ২১৬টি। সেবার বিপুল ভোটে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপির বর্তমান জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে এ আসনে মোট ভোট পড়েছিল ১ লাখ ২০ হাজার। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা শেহাবুদ্দিন পেয়েছিলেন ২ হাজার ৭৪৩ ভোট (২ দশমিক ২৮ শতাংশ)। আর ত্রয়োদশ নির্বাচনে এ আসনে জামায়াতে ইসলামী জোটের প্রার্থী নিজামুল হক পেয়েছেন ৫৭ হাজার ৩৫১ ভোট। প্রাপ্ত ভোটের ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ পড়েছে জামায়াতের বাক্সে। অর্থাৎ ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৭ শতাংশ হয়েছে জামায়াতের ভোট। ১৯৯৬ থেকে ২০২৬ তিন দশকের ব্যবধানে এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে প্রায় ২ হাজার শতাংশ।এদিকে, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম পেয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৯০ ভোট। যা প্রদত্ত ভোটের ৬৮ দশমিক ৮১ শতাংশ। ৯৬ পরবর্তী সময়ে এ আসনে বিএনপির ভোট বেড়েছে বহুগুণ।

NEWS21
NEWS21

ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা)

১৯৯১ সালের নির্বাচনে এই আসনে ভোট পড়েছিল ৭১ হাজার ৮৭৭টি। এর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. শাহজাহান পেয়েছিলেন ৭ হাজার ৯৭ ভোট (প্রায় ১০ শতাংশ)। ৯৬ সালের নির্বাচনে ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকে প্রফেসর জিয়াউল মোর্শেদ পান ৩ হাজার ২৪২ ভোট (২ দশমিক ৮০ শতাংশ)। এবারের নির্বাচনে এ আসনে ‘দাঁড়িপাল্লা’র প্রার্থী মোস্তফা কামাল পেয়েছেন ৮১ হাজার ৪৩৭ ভোট। যা প্রদত্ত ভোটের ২৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ। তিন দশকের ব্যবধানে এ আসনে জামায়াতের ভোট বেড়েছে ১ হাজার ১৪৬ শতাংশ। অপরদিকে, ১৯৯১ সালে বিএনপির প্রার্থী আমিনুল একরাম ভোট পেয়েছিলেন ৯ হাজার ১১০ (১২ দশমিক ৭ শতাংশ)। ১৯৯৬ সালে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী নাজিম উদ্দিন আলম ভোট পান প্রায় ৬৪ হাজার (৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ)। ২০২৬ সালে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রার্থী নূরুল ইসলাম নয়ন পেয়েছেন ১ লাখ ৮৯ হাজার ৩৫১ ভোট, যা প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৬৩ শতাংশ। ৯১ পরবর্তী সময়ে এ দলের ভোট বেড়েছে প্রায় ২ হাজার শতাংশ।

 ভোটার ও নেতাদের বক্তব্য

নির্বাচন নিয়ে কাজ করা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর ভোলা জেলা সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরীর মতে, বিগত নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোলায় ‘দাঁড়িপাল্লা’র ভোট বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘বিগত সরকারের অনিয়ম, স্বৈরাচারী আচরণ ও অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশব্যাপী যে চাঁদাবাজি হয়েছে, সে কারণে কিছু মানুষ বিকল্প হিসেবে দাঁড়িপাল্লাকে বেছে নিয়েছে। যে কারণে তাদের ভোট বেড়েছে।’ ভোটের মাঠে জামায়াতের এই উত্থানের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়কেই দায়ী করেন তিনি। তবে আওয়ামী লীগকে বেশি দায়ী করেছেন মোবাশ্বির উল্যাহ চৌধুরী। জামায়াতে ইসলামীর জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মো. হারুন অর রশিদ বলছেন, তাদের ভোটের সংখ্যা আরও বেশি ছিল। টার্গেটের চেয়ে কম ভোট পেয়েছে ‘দাঁড়িপাল্লা’। তিনি বলেন, ‘ভেতরের ইঞ্জিনিয়ারিং, বাইরে মব (বিশৃঙ্খলা) সৃষ্টি; এসব কারণে আমরা আমাদের ভোট ধরে রাখতে পারিনি। যেমন প্রত্যেকটা কেন্দ্রের বাইরে থেকে ২-৩শ লোক মব সৃষ্টি করেছে। ভেতরে ৭-৮ জন করে এজেন্ট দিয়েছে। এরপর পর্যবেক্ষকের নামে প্রতিকেন্দ্রে লোক দিয়ে সেখানেও মব সৃষ্টি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের (বিএনপির) লোক প্রিজাইডিং, সহকারী প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার হয়েছে। যে কারণে আমাদের এজেন্ট এক-দুইজন থাকলেও তারা কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।’ কয়েকটি কেন্দ্রে টাকা দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বড় ধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং করে আমাদের অর্জিত বিজয় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে।’ জেলার চারটি আসনেই তাদের অবস্থান প্রথম পর্যায়ে ছিল উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, ‘আমরা মব সৃষ্টি করতে পারিনি, ঠেকাতেও পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। ওদের মব সৃষ্টি এবং পাল্টা-পাল্টি ঠেকাতে পারলে আমাদের বিজয় ধরে রাখতে পারতাম।’ ভোট বাড়লেও এসব কারণে তারা সন্তুষ্ট নন। অন্যদিকে নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং বা মব সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) জেলা সেক্রেটারি মোতাছিন বিল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে জামায়াতে ইসলামী বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি বিরোধী অনেকে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়েছেন। এখানে জামায়াত ছিল মূল প্রতিদ্বন্দ্বী, তাই অনেকেই আবেগে জামায়াতের পক্ষ নিয়েছে। এছাড়া জামায়াতের সকল কর্মী-সমর্থক এক হয়ে মাঠে নামায় তারা ভোটে অনেকটা সুবিধা পেয়েছে।’ ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মো. রাইসুল আলম জানান, বিএনপির ভোট কমেনি, বরং বিএনপির জনসমর্থন আগের তুলনায় বেড়েছে। তিনি বলেন, ‘এত বছর বিএনপির সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। তাদের অনুপস্থিতিতে কিছু ভোট জামায়াতে ইসলামী টানতে পেরেছে। তবে এখনও ভোলায় জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী নয়।’