মোহনার বয়স এখনও ১১ পেরোয়নি। তুলতুলে নরম এ শিশুর শরীরের এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই। দেহের কোনো কোনো ক্ষত শুকিয়ে গেছে, কিন্তু ক্ষতের দাগ গেছে। কোনো কোনো আঘাতে চিহ্ন এখনও দগদগে। হাসপাতালের বেডে শুয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতর মোহনার চোখে মুখে অজনা ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। কথা বলতে গিয়েও বারবার আটকে যায়। শুধু অপলক তাকিয়ে থাকে। মা হারা এই শিশুটিকে দিনের পর দিন এমন নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অষ্টম তলার সার্জারি বিভাগের ৩ নম্বর বেডে ভর্তি করা হয়েছে।

গত শনিবার রাত ২টার দিকে মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা তার মেয়েকে উত্তরার ৯ নম্বর সেক্টরের সি/৭-এর ২৬ নম্বর বাড়ি থেকে উদ্ধার করে এ হাসপাতালে ভর্তি করান। গোলাম মোস্তফা তার শিশু মেয়েকে নির্যাতনের ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথী রহমানকে আসামি করে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলা করেছেন।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী মো. রফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলায় বিমান বাংলাদেশের এমডি শফিকুর রহমান, তার স্ত্রী বীথি, বাসার গৃহকর্মী রূপালী খাতুন ও সুফিয়া বেগমকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার মোহনার বাবা গোলাম মোস্তফা সমকালকে বলেন, তার গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড় সদর থানার হাড়িবাসা তালামা গ্রামে। মোহনার বয়স যখন ১ বছর তখন সড়ক দুর্ঘটনায় ওর মা মারা যান। আমি আর বিয়ে করিনি। হোটেলে জব করে বাপ বেটির সংসার চলছিল। গাজীপুর মহানগরের জরুন এলাকায় বসবাস করতেন।
তিনি আরও বলেন, গত কোরবানি ঈদের পরে একদিন তিনি উত্তরা এলাকায় ঘুরতে যান। একটি চা স্টলে বসে চা খাচ্ছিলেন গোলাম মোস্তফা। এ সময় এক নিরাপত্তাকর্মী আলাপ করছিলেন ২৬ নম্বর বাড়িতে একটি কাজের মেয়ে দরকার। তখন তিনি তার মেয়ে মোহনাকে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরদিন কথা মতো মেয়েকে ওই বাড়িতে নিয়ে যান। ওই পরিবারের সাড়ে ৩ বছরের এক শিশুকে দেখভাল করার দায়িত্ব অর্পিত হয় মোহনার কাধে। মোহনার ভরণপোষণ ও বিয়ে দেওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব নেন বাড়ির মালিক বীথি রহমান।
গোলাম মোস্তফা বলেন, মাঝে মধ্যে মেয়েকে দেখতে যান, মাঝে মাঝে আবার মোবাইল ফোনেও কথা হতো। কিন্তু গত ২ মাস ধরে তিনি যেতে পারছিলেন না। শনিবার রাতে মেয়েকে দেখতে যান ওই বাড়িতে। ক্ষত বিক্ষত মেয়েকে দেখেই সেখানে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, এক পর্যায়ে তারা ২টার দিকে মোহনাকে নিয়ে আসেন। পরে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। এরই মধ্যে উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি মামলাও করেন তিনি। বলেন, সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে শিশুটিকে তার কাছে হস্তান্তর হয়। ঘটনাটি কাউকে না জানাতে নানা ধরনের ভয়ভীতিও দেখানো হয়।
গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজের আবাসিক ডাক্তার এসকে ফরহাদ সমকালকে বলেন, শিশুটির চিকিৎসা চলছে। তবে আগের চেয়ে এখন একটু ভালো।
প্রতিনিধির নাম 












