যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগ, একাধিক সরকারি পদ দখল ও অস্বাভাবিক সম্পদের পাহাড়!
মনোহরগঞ্জ দারুল উলুম ক্যারামতিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমানকে ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অনুসন্ধান। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার দারুল উলুম ক্যারামতিয়া মাদ্রাসায় আরবি শিক্ষক হিসেবে মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমানের নিয়োগ থেকে শুরু করে পদোন্নতি, একই সঙ্গে একাধিক সরকারি দায়িত্ব পালন এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের ঘটনায় একাধিক আইন ও বিধি লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত শিক্ষাগত সনদ, নিয়োগপত্র ও স্থানীয় তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিকল্পিত অনিয়ম ছাড়া সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিয়োগ বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাষক পদে নিয়োগঃ
বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী, প্রভাষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীকে দাখিল, আলিম, ফাজিল এবং কামিল (দ্বিতীয় শ্রেণী)সহ সব পরীক্ষায় কমপক্ষে দ্বিতীয় শ্রেণী বা বিভাগে উত্তীর্ণ হতে হবে। এই শর্ত মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের নিয়োগ সংক্রান্ত বিধিমালার বাধ্যতামূলক অংশ।
কিন্তু অনুসন্ধানে পাওয়া মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমানের শিক্ষাগত সনদ অনুযায়ী, তিনি দাখিল পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণী এবং আলিম পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণী অর্জন করেন। পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে দ্বিতীয় শ্রেণী পেলেও নিয়োগের মৌলিক যোগ্যতা তিনি পূরণ করেননি।
প্রশ্ন উঠছে, নিয়োগ বোর্ড কীভাবে এই সনদ যাচাই করল, কোন ক্ষমতাবলে তাকে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হলো এবং এই নিয়োগ অনুমোদন পেল কীভাবে।
বিধি ভেঙে চাকরিতে বহাল থাকা
অভিযোগ রয়েছে, যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘদিন ওই পদে বহাল আছেন এবং সরকারি এমপিও সুবিধাসহ সব সুযোগ গ্রহণ করে আসছেন। মাদ্রাসা শিক্ষা বিধিমালা অনুযায়ী, ভুয়া বা অযোগ্য নিয়োগ প্রমাণিত হলে তা বাতিলযোগ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও এই ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
একই ব্যক্তির একাধিক সরকারি দায়িত্বঃ
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে বহাল থাকা অবস্থায় কাজী হিসেবে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তিনি একাধিক ইউনিয়নে কাজীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
কিন্তু সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী, একজন সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি অনুমোদন ছাড়া একাধিক সরকারি পদ বা দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। একই সঙ্গে একজন পূর্ণকালীন শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় কাজীর দায়িত্ব পালন করা স্পষ্টভাবে স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) তৈরি করে।

কাজীর দায়িত্বে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগঃ
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করেছেন। বিয়ের নিবন্ধনসহ বিভিন্ন সেবায় অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি নিয়মিত অভিযোগে উঠে এলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি বলে দাবি এলাকাবাসীর।
প্রশ্নবিদ্ধ পদোন্নতিঃ
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, ২০১০ সালে মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান। মাদ্রাসা শিক্ষক পদোন্নতি নীতিমালা অনুযায়ী, মূল নিয়োগ বৈধ ও বিধিসম্মত না হলে কোনোভাবেই পদোন্নতি দেওয়া যায় না।
অভিযোগ উঠেছে, যোগ্যতা বহির্ভূত নিয়োগের ওপর ভিত্তি করেই তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা পুরো পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে অবৈধ করে তোলে। এতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তা ও অনুমোদনকারী দপ্তরের ভূমিকা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
অস্বাভাবিক সম্পদের হিসাবঃ
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাওলানা মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান মনোহরগঞ্জ এলাকায় পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছেন এবং বিভিন্ন সময়ে একাধিক জায়গা ও জমি ক্রয় করেছেন। স্থানীয়দের দাবি, একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও কাজীর ঘোষিত বৈধ আয়ের সঙ্গে এই পরিমাণ সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, কোনো সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ অর্জন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এলাকাবাসীর দাবি, এই সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে দেখলেই অনিয়মের চিত্র স্পষ্ট হবে।
স্থানীয়দের দাবি ও প্রশাসনের দায়ঃ
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, এটি শুধু একজন ব্যক্তির অনিয়ম নয়; বরং নিয়োগ বোর্ড, সনদ যাচাইকারী কর্তৃপক্ষ, পদোন্নতি অনুমোদনকারী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সম্মিলিত ব্যর্থতা। তারা অবিলম্বে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন, সব নিয়োগ ও পদোন্নতি বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া শুরু এবং অস্বাভাবিক সম্পদের তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষের কোনো লিখিত বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ 
















